ChamberBD Logo ChamberBD
Illustration of Bangladeshi parents gently caring for their newborn baby at home

নবজাতকের প্রথম মাসের যত্ন: নতুন বাবা-মায়ের পূর্ণাঙ্গ গাইড

জন্মের পর প্রথম চার সপ্তাহ—নবজাতককাল—শিশুর জীবনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অধ্যায়। বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর বড় অংশই ঘটে এই প্রথম মাসে, অথচ সঠিক ঘরোয়া যত্নেই এর বেশিরভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। নতুন বাবা-মায়ের চারপাশে আত্মীয়-প্রতিবেশীর পরামর্শের অভাব নেই—কিছু উপকারী, কিছু রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ। ডাক্তার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) আসলে কী পরামর্শ দেয়, তা নিয়েই এই গাইড—যেন আত্মবিশ্বাস নিয়ে শিশুর যত্ন নিতে পারেন।

প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধই কেন যথেষ্ট?

ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর খাবার, পানি ও রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি—সবকিছুই বুকের দুধে আছে; এমনকি গরমের দিনেও আলাদা পানি লাগে না। জন্মের পর ঘন হলদেটে যে দুধ আসে—শালদুধ (colostrum)—এটি শিশুর প্রথম টিকার মতো কাজ করে, তাই কখনোই ফেলে দেবেন না। জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ শুরু করুন এবং শিশু চাইলেই খাওয়ান—২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৮-১২ বার।

প্রথম দিনগুলোতে মধু, চিনির পানি, মিষ্টি, সাধারণ পানি বা ফর্মুলা দেওয়ার প্রচলিত অভ্যাস এড়িয়ে চলুন। এতে শিশুর পেটে সংক্রমণ হতে পারে, মায়ের দুধও কমে যায়—কোনো উপকারই নেই। ডাক্তার নির্দিষ্টভাবে বললে তবেই ফর্মুলা।

নাভির যত্ন কীভাবে নেবেন?

নাভি পরিষ্কার ও পুরোপুরি শুকনো রাখুন, আর তাতে কিছুই লাগাবেন না—তেল, হলুদ, ছাই, স্পিরিট বা পাউডার কিছুই নয়, যদি না ডাক্তার আলাদা করে বলেন। ন্যাপি নাভির নিচে ভাঁজ করে পরান, যেন প্রস্রাবে ভিজে না যায়। সাধারণত এক-দুই সপ্তাহে নাভি শুকিয়ে নিজে থেকেই পড়ে যায়। নাভির চারপাশ লাল বা ফোলা দেখালে, পুঁজ পড়লে বা দুর্গন্ধ হলে দ্রুত ডাক্তার দেখান।

গোসল, উষ্ণতা ও ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার

নবজাতকের শরীর খুব দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়, তাই উষ্ণ রাখা আক্ষরিক অর্থেই জীবনরক্ষাকারী। জন্মের অন্তত ২৪ ঘণ্টা পর প্রথম গোসল দিন; নাভি না পড়া পর্যন্ত উষ্ণ, বাতাসের ঝাপটা-মুক্ত ঘরে কুসুম গরম পানিতে গা মুছিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট। মাথা ভালো করে মুছে দিন এবং নিজের চেয়ে এক পরত বেশি কাপড় পরান।

ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার—খালি বুকের সঙ্গে শিশুকে ত্বকে-ত্বক লাগিয়ে সোজা করে ধরে রাখা—শিশুর তাপমাত্রা স্থির রাখে, দুধ খাওয়ায় উৎসাহ দেয় ও শিশুকে শান্ত করে। কম ওজনের শিশুর জন্য এটি বিশেষ উপকারী; বাবাও এটি করতে পারেন।

নবজাতকের জন্ডিস কি স্বাভাবিক, নাকি বিপজ্জনক?

অনেক সুস্থ নবজাতকের জন্মের দ্বিতীয়-তৃতীয় দিনে ত্বক ও চোখ হালকা হলুদ দেখায়, যা শিশু ঠিকমতো খেলে ও সচল থাকলে এক-দুই সপ্তাহে এমনিতেই চলে যায়। কিন্তু জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জন্ডিস দেখা দিলে, হাতের তালু ও পায়ের তলা হলুদ হলে, বা শিশু খেতে না পেরে ঝিমিয়ে পড়লে—এটা বিপজ্জনক হতে পারে। এমন হলে সেদিনই ডাক্তার দেখিয়ে প্রয়োজনে বিলিরুবিন পরীক্ষা করান। এসব সতর্ক লক্ষণ থাকলে শুধু রোদে শোয়ানো বা ঘরোয়া টোটকায় ভরসা করবেন না।

নিরাপদ ঘুম ও প্রথম টিকা

শিশুকে সবসময় চিত করে (পিঠের ওপর) শক্ত সমান বিছানায় শোয়ান; মুখের কাছে নরম বালিশ, ভারী কাঁথা-কম্বল বা ঢিলেঢালা মশারি রাখবেন না। শিশু মায়ের ঘরেই থাকুক, তবে অতিরিক্ত গরম পোশাকে মুড়িয়ে ফেলবেন না, আর সোফায় শিশুকে নিয়ে কখনো ঘুমাবেন না।

বাংলাদেশের ইপিআই (EPI) কর্মসূচিতে টিকা শুরু হয় জন্ম থেকেই: জন্মের পরপর বিসিজি ও পোলিওর প্রথম ডোজ, এরপর ছয় সপ্তাহে পরের রাউন্ড। সরকারি ইপিআই কেন্দ্রে এসব টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়—টিকা কার্ড যত্নে রাখুন, কোনো তারিখ মিস করবেন না। নিজে থেকে শিশুকে কোনো ওষুধ, গ্রাইপ ওয়াটার বা টোটকা খাওয়াবেন না; ডাক্তার কিছু লিখে দিলে চেম্বারবিডির ওষুধ ডিরেক্টরিতে তা দেখে নিতে পারেন।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

নবজাতক খুব দ্রুত মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, তাই বিপদ চিহ্ন দেখলে রাত পার করার অপেক্ষা নয়। নিচের যেকোনো লক্ষণে দ্রুত ডাক্তার বা হাসপাতালে যান:

  • ঠিকমতো দুধ টানতে না পারা বা খাওয়া ছেড়ে দেওয়া
  • দ্রুত শ্বাস (মিনিটে ৬০ বার বা বেশি), ঘড়ঘড় শব্দ বা শ্বাসের সঙ্গে বুক দেবে যাওয়া
  • জ্বর (৩৮° সেলসিয়াস বা বেশি) কিংবা শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা (৩৫.৫° সেলসিয়াসের নিচে)
  • হাতের তালু-পায়ের তলা হলুদ, বা প্রথম ২৪ ঘণ্টায় জন্ডিস
  • প্রথম সপ্তাহের পর দিনে ছয়বারের কম প্রস্রাব বা ভেজা ন্যাপি
  • খিঁচুনি, অস্বাভাবিক ঝিমুনি বা ক্ষীণ কান্না
  • নাভির চারপাশে লালচে ভাব, পুঁজ, বা গায়ে অনেক ফুসকুড়ি

মায়ের কথাও ভুলবেন না: প্রথম ছয় সপ্তাহে প্রসব-পরবর্তী চেকআপ, ডাক্তারের দেওয়া আয়রন-ক্যালসিয়াম, বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার ও মানসিক সমর্থন—সবই জরুরি। মায়ের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা বা টানা মন খারাপ থাকলে তারও চিকিৎসা দরকার। ঘরে বসেই চেম্বারবিডিতে ভেরিফায়েড শিশু বিশেষজ্ঞ বা গাইনি ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে পারেন।

এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।