হাত-পা-মুখ রোগ: শিশুর যত্ন ও করণীয়
হাত-পা-মুখ রোগ (HFMD) শিশুদের একটি সাধারণ সংক্রমণ, যা প্রায়ই স্কুল, ডে-কেয়ার ও ঘরে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশে বহু অভিভাবককে দুশ্চিন্তায় ফেলে। নামটি ভয় ধরালেও রোগটি সাধারণত মৃদু এবং এক সপ্তাহ থেকে দশ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। বেশিরভাগ শিশুই কোমল ঘরোয়া যত্নে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে। র্যাশ, মুখের ঘা এবং ছড়ানো ঠেকানোর সহজ পরিচ্ছন্নতার নিয়ম বুঝলে পরিবার শান্ত থাকতে পারে এবং অন্য শিশুদেরও নিরাপদ রাখতে পারে।
হাত-পা-মুখ রোগ কী?
HFMD একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যদিও বড় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করাও মাঝে মাঝে আক্রান্ত হতে পারে। এটি একদল ভাইরাসের কারণে হয় এবং কাশি-হাঁচি, লালা, ফোস্কার ভেতরের তরল, এবং না-ধোয়া হাত বা জিনিসের সংস্পর্শে ছড়ায়। গরম, আর্দ্র আবহাওয়ায় এবং যেখানে ছোট শিশুরা ঘনিষ্ঠভাবে জড়ো হয়, সেখানে এর প্রকোপ বেশি। এটি গবাদিপশুর ফুট-অ্যান্ড-মাউথ রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
লক্ষণ ও সতর্ক-সংকেত কী?
সংস্পর্শের তিন থেকে ছয় দিন পর সাধারণত উপসর্গ দেখা দেয় এবং তা মোটামুটি একটি চেনা ধাঁচে এগোয়।
- প্রথমে হালকা জ্বর, গলাব্যথা ও খাবারে অরুচি।
- মুখের ভেতরে, জিভে ও মাড়িতে ছোট ছোট বেদনাদায়ক ঘা বা ফোস্কা।
- হাতের তালু, পায়ের তলা এবং কখনও নিতম্ব ও হাঁটুতে ছোট লাল দানা বা ফোস্কার র্যাশ।
- মুখের ব্যথায় খিটখিটে ভাব, লালা ঝরা এবং খেতে বা পান করতে অনীহা।
রোগটি সাধারণত মৃদু, তবে কিছু বিপদের লক্ষণে নজর রাখুন—যেমন সব ধরনের তরল প্রত্যাখ্যান, খুব কম প্রস্রাব, না-কমা উচ্চ জ্বর, ঝিমুনি, বারবার বমি বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, যেগুলোতে দ্রুত চিকিৎসা দরকার।
ঘরে শিশুর যত্ন কীভাবে নেবেন?
ভাইরাস সেরে যাওয়ার সময়টায় ঘরোয়া যত্নের মূল লক্ষ্য শিশুকে আরামে রাখা ও পর্যাপ্ত তরল দেওয়া। কয়েকটি কোমল ব্যবস্থা অনেকটা সাহায্য করে।
- প্রচুর ঠান্ডা তরল দিন—পানি, দুধ, খাবার স্যালাইন (ORS) ও ঠান্ডা দইয়ের পানীয়।
- নরম, সাদামাটা খাবার দিন এবং মুখে জ্বালা ধরায় এমন ঝাল, নোনতা বা টক খাবার এড়িয়ে চলুন।
- জ্বর বা ব্যথায় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মাত্রায় প্যারাসিটামল দিন; এ বিষয়ে মেডিসিন ডিরেক্টরিতে জেনে নিতে পারেন।
- কাস্টার্ড, আইসক্রিম বা ঠান্ডা ফলের মতো শীতল খাবার ব্যথাযুক্ত মুখকে আরাম দিতে দিন।
- র্যাশ পরিষ্কার রাখুন এবং ফোস্কা ফাটাবেন না।
শিশুকে অ্যাসপিরিন দেবেন না, এবং উদ্বৃত্ত বা অন্যের ওষুধ কখনও ব্যবহার করবেন না; শিশুর ওজন অনুযায়ী সঠিক প্যারাসিটামল মাত্রা ডাক্তার বা ফার্মাসিস্ট নিশ্চিত করে দিতে পারেন।
ছড়ানো কীভাবে ঠেকাবেন?
HFMD সহজে ছড়ায়, তাই ভালো পরিচ্ছন্নতা ভাইবোন, সহপাঠী ও অভিভাবকদের রক্ষা করে।
- বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন, বিশেষত ন্যাপি বদলানোর পর ও খাওয়ার আগে।
- জ্বর না কমা ও ভালো বোধ না করা পর্যন্ত শিশুকে স্কুল বা ডে-কেয়ার থেকে বাড়িতে রাখুন।
- অসুস্থ অবস্থায় কাপ, চামচ, তোয়ালে বা খেলনা ভাগাভাগি করবেন না।
- খেলনা, আসবাব ও দরজার হাতল নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করুন।
- শিশুদের কাশি-হাঁচি ঢেকে রাখতে ও হাত ধুতে শেখান।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
শিশু যদি পান করতে না পারে ও পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখায়, না-কমা উচ্চ জ্বর থাকে, খুব ঝিমিয়ে পড়ে বা অস্বাভাবিক খিটখিটে হয়, বারবার বমি করে, ঘাড় শক্ত হয়ে যায়, কিংবা কয়েক দিন পর উপসর্গ ভালো হওয়ার বদলে বাড়তে থাকে—তবে ডাক্তার দেখান। খুব ছোট শিশু ও অন্য রোগে ভোগা শিশুদের আরও আগেই পরীক্ষা করানো উচিত। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ খুঁজে নিতে পারেন আমাদের নিবন্ধিত ডাক্তারের তালিকা থেকে, আর শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে আরও স্বাস্থ্য টিপস দেখুন। এই লেখাটি কেবল সাধারণ তথ্যের জন্য; এটি যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শের বিকল্প নয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
হাত-পা-মুখ রোগ কত দিন সংক্রামক থাকে?
অসুস্থতার প্রথম সপ্তাহে শিশু সবচেয়ে বেশি সংক্রামক থাকে, তবে ভাইরাস কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত পায়খানায় থাকতে পারে। জ্বর না কমা ও ভালো বোধ না করা পর্যন্ত শিশুকে বাড়িতে রাখুন, এবং স্কুলে ফেরার পরও যত্ন করে হাত ধোয়া চালিয়ে যান।
মুখে ব্যথাযুক্ত ঘা থাকলে শিশু কী খেতে পারে?
দই, কাস্টার্ড, ম্যাশ করা আলু, খিচুড়ি, আইসক্রিম ও ঠান্ডা দুধের মতো নরম, ঠান্ডা ও সাদামাটা খাবার দিন। জ্বালা ধরায় এমন ঝাল, নোনতা, টক বা খুব গরম খাবার এড়িয়ে চলুন। প্রথম এক-দুই দিন শক্ত খাবারের চেয়ে তরল ঠিক রাখা বেশি জরুরি।
HFMD-তে কি শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক দেব?
না। HFMD ভাইরাসজনিত, তাই অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ হয় না। চিকিৎসা সহায়ক—তরল, নরম খাবার এবং ব্যথা বা জ্বরে প্যারাসিটামল। কেবল বিপদের লক্ষণে বা আলাদা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের সন্দেহে ডাক্তার দেখান; নিজে থেকে কখনও অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না।
প্রাপ্তবয়স্করা কি হাত-পা-মুখ রোগে আক্রান্ত হতে পারে?
হ্যাঁ, যদিও এটি ছোট শিশুদের মধ্যেই অনেক বেশি দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক ও বড় ভাইবোনরা আক্রান্ত হতে পারে, কখনও মৃদু উপসর্গে। ভালোভাবে হাত ধোয়া এবং অসুস্থ শিশুর সঙ্গে বাসন বা তোয়ালে ভাগাভাগি না করা ঘরে ছড়ানোর আশঙ্কা কমায়।