ChamberBD Logo ChamberBD
See in English

বুকের দুধ খাওয়ানো: ল্যাচ, দুধ বাড়ানো ও সমস্যা

বুকের দুধ খাওয়ানো আপনার শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালো কাজগুলোর একটি, আর বাংলাদেশে এটি একই সঙ্গে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ পছন্দ। বুকের দুধ পূর্ণ পুষ্টি দেয়, সংক্রমণ ও ডায়রিয়া থেকে রক্ষা করে এবং পরবর্তী জীবনে মায়ের কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। তবু অনেক নতুন মা ঠিকমতো ল্যাচ না হওয়া, বোঁটা ফেটে যাওয়া কিংবা দুধ কম হওয়ার ভয়ে কষ্ট পান এবং চাওয়ার আগেই খাওয়ানো বন্ধ করে দেন। একটু জ্ঞান ও সহায়তা পেলে এর বেশিরভাগ সমস্যাই সমাধান করা যায়। এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য; এটি যোগ্য ডাক্তার বা ল্যাকটেশন কাউন্সেলরের পরামর্শের বিকল্প নয়।

একচেটিয়া বুকের দুধ এত জরুরি কেন?

ডাক্তাররা প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেন—পানি, মধু, চিনির পানি বা ফর্মুলা কিছুই নয়, গরমেও নয়, কারণ বুকের দুধেই যথেষ্ট পানি থাকে। প্রথম ঘন হলুদ দুধ, যাকে শাল দুধ (কোলস্ট্রাম) বলে, রোগ প্রতিরোধে ভরপুর এবং তা ফেলে দেওয়া উচিত নয়। জন্মের পর পরই ত্বকে-ত্বক সংস্পর্শ এবং প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে খাওয়ানো শুরু করা মা-শিশুর বন্ধন ও দুধ আসা—দুটোতেই সাহায্য করে। ছয় মাস পর বুকের দুধ চালিয়ে দুই বছর পর্যন্ত পারিবারিক খাবার যোগ করা হয়।

সঠিক ল্যাচ ও ভঙ্গি কীভাবে পাবেন?

সঠিক ল্যাচই ব্যথাহীন খাওয়ানো ও ভালোভাবে পেট ভরা শিশুর গোপন রহস্য। শিশুকে বুকের কাছে আনুন, বুককে শিশুর কাছে নয়, আর বোঁটা মুখের তালুর দিকে তাক করুন।

  • শিশুর মুখ হাঁ করে বড় থাকবে, শুধু বোঁটার আগা নয়, কালো অংশের (অ্যারিওলা) বড় অংশ মুখে নেবে।
  • থুতনি বুকে লাগবে, নিচের ঠোঁট বাইরের দিকে উল্টানো থাকবে, আর ঠোঁটের নিচের চেয়ে ওপরে বেশি অ্যারিওলা দেখা যেতে পারে।
  • খাওয়ানোতে ব্যথা হওয়ার কথা নয়; খটখট শব্দ নয়, নরম গিলে খাওয়ার শব্দ শোনা উচিত।
  • বিভিন্ন ভঙ্গি চেষ্টা করুন—কোলে নিয়ে, পাশ ফিরে শুয়ে, কিংবা সিজারের পর বগলের নিচে ধরে (ফুটবল হোল্ড)।
  • ঘড়ি ধরে নয়, শিশু ক্ষুধার লক্ষণ দেখালেই চাহিদা অনুযায়ী খাওয়ান।

দুধ কীভাবে বাড়াবেন?

দুধ চলে চাহিদা ও জোগানের নিয়মে: শিশু যত বেশি খায় ও বুক খালি করে, তত বেশি দুধ তৈরি হয়। যেসব মা ভাবেন দুধ কম, তাদের বেশিরভাগই আসলে যথেষ্ট দুধ তৈরি করছেন।

  • দিনে-রাতে ঘন ঘন খাওয়ান এবং এক বুক শেষ করতে দিয়ে তারপর অন্যটি দিন।
  • ল্যাচ ঠিক আছে কি না নিশ্চিত করুন, কারণ ভুল ল্যাচে দুধ ঠিকমতো বের হয় না।
  • নিয়মিত সুষম খাবার খান ও যথেষ্ট পানি পান করুন; দামি বিশেষ কোনো খাবার লাগে না।
  • সুযোগ পেলে বিশ্রাম নিন এবং প্রথম কয়েক সপ্তাহ ঘরের কাজ ভাগ করে নিতে পরিবারকে বলুন।
  • অপ্রয়োজনে বোতল বা ফর্মুলা দেবেন না, কারণ এতে শিশুর চাহিদা ও আপনার দুধ দুটোই কমে।

ফাটা বোঁটা ও বুক শক্ত হয়ে যাওয়া (এনগর্জমেন্ট) কীভাবে সামলাবেন?

বোঁটা ব্যথা বা ফেটে যাওয়া সাধারণত ভুল ল্যাচের কারণে হয়, তাই প্রথম কাজ ল্যাচ ঠিক করা; এ ছাড়া একটু দুধ চিপে বোঁটায় মাখিয়ে বাতাসে শুকাতে দিতে পারেন। বুক শক্ত, ফোলা ও ব্যথা হয়ে গেলে (এনগর্জমেন্ট) ঘন ঘন খাওয়ানো, আলতো মালিশ, খাওয়ানোর আগে গরম ও পরে ঠান্ডা সেঁক দিয়ে আরাম মেলে। জ্বরসহ লাল ও ব্যথাযুক্ত জায়গা ম্যাস্টাইটিস (বুকের সংক্রমণ) হতে পারে, যার চিকিৎসা দরকার। আক্রান্ত পাশ থেকে খাওয়ানো চালিয়ে যান, কারণ বন্ধ করলে এনগর্জমেন্ট আরও বাড়ে।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

ল্যাচ ঠিক করার চেষ্টার পরও খাওয়ানো ব্যথাযুক্ত থাকলে, বোঁটা বাজেভাবে ফেটে বা রক্ত বের হলে, কিংবা জ্বরসহ বুকে শক্ত-লাল-গরম জায়গা থাকলে (যা ম্যাস্টাইটিসের ইঙ্গিত) ডাক্তার বা ল্যাকটেশন কাউন্সেলর দেখান। এ ছাড়া শিশুর ওজন না বাড়লে, খুব কম প্রস্রাব হলে (দিনে ছয়টির কম ভেজা ন্যাপি), খুব ঘুমিয়ে থাকলে বা ঠিকমতো না খেলে দ্রুত যাচাই করানো দরকার। আপনি প্যাডিয়াট্রিশিয়ান বা গাইনোকোলজিস্টের মতো সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দেখুন, নির্ধারিত কোনো ওষুধ মেডিসিন ডিরেক্টরিতে যাচাই করুন এবং শিশু ও মায়ের যত্ন নিয়ে পড়ুন আরও স্বাস্থ্য টিপস। সঠিক সহায়তায় খাওয়ানোর বেশিরভাগ সমস্যা দ্রুত ভালো হয়ে যায়।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

আমার শিশু যথেষ্ট দুধ পাচ্ছে কিনা বুঝব কীভাবে?

সবচেয়ে আশ্বস্ত করা লক্ষণ হলো শিশুর দিনে অন্তত ছয়টি ভেজা ন্যাপি হওয়া, ভালোভাবে খাওয়া ও খাওয়ার পর তৃপ্ত মনে হওয়া এবং সপ্তাহে সপ্তাহে নিয়মিত ওজন বাড়া। দুধ মাপার দরকার নেই; বুক কতটা ভরা লাগে তার চেয়ে ভালো প্রস্রাব ও ওজন বাড়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের গরমে কি শিশুকে পানি দেব?

না। প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধই শিশুর সব পানি ও খাবারের চাহিদা মেটায়, গরমেও, আর পানি দিলে শিশুর পেট ভরে যায় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। খুব গরম হলে পানি না দিয়ে বরং আরও ঘন ঘন খাওয়ান।

আমি অসুস্থ থাকলে বা ওষুধ খেলে কি বুকের দুধ খাওয়াতে পারি?

সর্দি-কাশির মতো সাধারণ বেশিরভাগ অসুখে আপনি নিরাপদে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন, এতে শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধও যায়। অনেক ওষুধ বুকের দুধ খাওয়ানোয় নিরাপদ, তবে কিছু নয়—তাই যেকোনো ডাক্তারকে জানান আপনি দুধ খাওয়াচ্ছেন এবং যাচাই না করে নিজে থেকে ওষুধ খাবেন না।

প্রথম দিকে দুধ খাওয়াতে ব্যথা হওয়া কি স্বাভাবিক?

প্রথম কয়েক দিন সামান্য ব্যথা সাধারণ, তবে একটানা ব্যথা সাধারণত ভুল ল্যাচের লক্ষণ, যা শুধু সহ্য করার কিছু নয়। ভঙ্গি ও ল্যাচ ঠিক করলে প্রায়ই ব্যথা কমে যায়, আর না কমলে ল্যাকটেশন কাউন্সেলর বা ডাক্তার সাহায্য করতে পারেন।

এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

এই তথ্যটি কি আপনার কাজে লেগেছে?