ত্বকের ফাঙ্গাল ইনফেকশন: দাদ, চুলকানি ও বর্ষায় ত্বকের যত্ন
প্রতি বর্ষায় বাংলাদেশের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের চেম্বারে একই রোগীর ঢল নামে: কুঁচকি, কোমর আর বগলে গোল গোল চুলকানিযুক্ত দাগ, যা কিছুতেই সারছে না। গরম, আর্দ্রতা, ঘামে ভেজা কাপড় আর গাদাগাদি বসবাস — আমাদের দেশ ত্বকের ফাঙ্গাসের জন্য যেন স্বর্গরাজ্য। আর ফার্মেসির ভুল ক্রিম একটি সাধারণ সংক্রমণকে বানিয়ে ফেলছে জেদি, বারবার ফিরে আসা রোগ।
বাংলাদেশে ফাঙ্গাল ইনফেকশন এত ছড়ায় কেন?
ফাঙ্গাস ভালোবাসে গরম আর ভেজা পরিবেশ — আমাদের আবহাওয়া বছরের বেশিরভাগ সময় দুটোই জোগায়। টাইট সিনথেটিক কাপড়ের নিচে আটকে থাকা ঘাম, ভেজা ত্বকের ভাঁজ, ভাগাভাগি করা তোয়ালে-চিরুনি-বিছানার চাদর, আর বর্ষায় পুরোপুরি না শুকানো কাপড় — সবই ফাঙ্গাসকে বাড়তে ও একজন থেকে আরেকজনে ছড়াতে সাহায্য করে। যাঁরা বেশি ঘামেন, যাঁদের ওজন বেশি বা ডায়াবেটিস আছে, তাঁদের ঝুঁকি আরও বেশি।
দাদ, জক ইচ ও অ্যাথলেটস ফুট চেনার উপায়
দাদ (ringworm) আসলে কোনো কৃমি বা পোকা নয় — এটি ফাঙ্গাল সংক্রমণ, যা দেখায় চুলকানিযুক্ত, ধীরে ধীরে বড় হওয়া গোল চাকার মতো; কিনারা উঁচু ও খসখসে, মাঝখানটা তুলনামূলক পরিষ্কার।
- জক ইচ: কুঁচকি ও ঊরুর ভেতরের দিকে চুলকানিযুক্ত লালচে-বাদামি ছোপ, প্রায়ই দুই পাশে — গরমে খুবই সাধারণ।
- অ্যাথলেটস ফুট: পায়ের আঙুলের ফাঁকে চুলকানি, চামড়া ওঠা ও ফাটা, সঙ্গে দুর্গন্ধ থাকতে পারে; সারাদিন বন্ধ জুতা পরলে বেশি হয়।
- শরীর ও মাথার দাদ: শরীরের যেকোনো জায়গায় গোল ছোপ; মাথায় হলে ভাঙা চুলসহ ছোপ ছোপ টাক পড়তে পারে, বিশেষ করে শিশুদের।
স্টেরয়েড মেশানো ক্রিম কেন দাদকে আরও খারাপ করছে?
বাংলাদেশের দোকানে দেদার বিক্রি হওয়া 'জাদুকরী' ক্রিমগুলোতে সাধারণত স্টেরয়েডের সঙ্গে অ্যান্টিফাঙ্গাল ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল মেশানো থাকে। স্টেরয়েড কয়েক দিনেই চুলকানি কমায়, তাই মনে হয় ক্রিমটা কাজ করছে — কিন্তু আসলে এটি ত্বকের প্রতিরোধ দুর্বল করে, ফাঙ্গাসকে আরও ছড়াতে দেয় আর রোগের চেহারাই বদলে দেয়, ফলে ডাক্তারের পক্ষেও রোগ চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। মাসের পর মাস এমন ক্রিম ব্যবহারের ফলেই দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ছড়িয়েছে কঠিন, ওষুধ-প্রতিরোধী দাদের মহামারি — ঠিক যেভাবে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে তৈরি হয় প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া; পড়ুন আমাদের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে লেখাটি। দোকানির কথায় ক্রিম কিনবেন না; হাতে ধরিয়ে দেওয়া যেকোনো ওষুধ আমাদের ওষুধের ডিরেক্টরিতে দেখে নিন এবং ডাক্তারের সঙ্গে নিশ্চিত হয়ে নিন।
সঠিক চিকিৎসা: পুরো কোর্স শেষ করুন
সঠিক অ্যান্টিফাঙ্গাল চিকিৎসা — ছোট ছোপে শুধু ক্রিম, ছড়ানো বা জেদি সংক্রমণে ক্রিমের সঙ্গে ট্যাবলেট — কোথায় ও কতটা হয়েছে দেখে ঠিক করবেন রেজিস্টার্ড ডাক্তার। রোগ সারা আর বারবার ফিরে আসার পার্থক্য গড়ে দেয় দুটি নিয়ম:
- ডাক্তারের বলা পুরো সময় ওষুধ চালিয়ে যান — চুলকানি ও দাগ চলে যাওয়ার পরও সাধারণত আরও কয়েক সপ্তাহ; আগে থামিয়ে দেওয়াই রোগ ফেরার সবচেয়ে বড় কারণ।
- পরিবারের আক্রান্ত সবার চিকিৎসা একসঙ্গে করান এবং কাপড়, তোয়ালে, বিছানার চাদর ধুয়ে কড়া রোদে শুকান — নইলে একজন থেকে আরেকজনে সংক্রমণ ঘুরতেই থাকবে।
পুরো চিকিৎসার পরও বারবার ফিরে এলে ডাক্তারকে বলে রক্তের সুগার পরীক্ষা করান — বারবার ফাঙ্গাল ইনফেকশন ডায়াবেটিসের একটি পরিচিত আগাম সংকেত।
প্রতিরোধ: ত্বক শুকনো রাখুন, ব্যক্তিগত জিনিস আলাদা রাখুন
- প্রতিদিন গোসল করুন এবং ত্বকের ভাঁজগুলো — কুঁচকি, বগল, স্তনের নিচ, আঙুলের ফাঁক — পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে ভালো করে শুকিয়ে নিন।
- ঢিলেঢালা সুতির জামা ও সুতির অন্তর্বাস পরুন; প্রতিদিন বদলান, ঘামে ভিজে গেলে আরও আগে।
- তোয়ালে, চিরুনি, টুপি, জুতা বা বিছানার চাদর কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করবেন না।
- সম্ভব হলে গরম পানিতে কাপড়-তোয়ালে ধুয়ে সরাসরি রোদে শুকান; টানা স্যাঁতসেঁতে দিনে অন্তর্বাস ইস্ত্রি করে নিন।
- যাঁরা খুব ঘামেন, ত্বকের ভাঁজে অ্যান্টিফাঙ্গাল পাউডার কাজে দিতে পারে — ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
ক্রিম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে শুরুতেই ডাক্তার দেখান — শুরুর দিকেই ফাঙ্গাল ইনফেকশন সবচেয়ে সহজে সারে। নিচের যেকোনোটি মিলে গেলে দেরি করবেন না:
- দাগ ছড়িয়ে পড়ছে, মুখে বা মাথায় হয়েছে, কিংবা শরীরের বড় অংশজুড়ে
- চুলকানিতে ঘুম বা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে
- স্টেরয়েড মেশানো ক্রিম ব্যবহারের পর দাগ বদলে গেছে বা বেড়েছে
- ত্বকে ব্যথা, রস গড়ানো বা মামড়ি — সঙ্গে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন যোগ হওয়ার লক্ষণ
- বারবার ফিরে আসছে, অথবা আপনার ডায়াবেটিস আছে বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম
ChamberBD-তে রেজিস্টার্ড চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ খুঁজে অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে পারেন।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।