চোখের ক্লান্তি ও স্ক্রিন টাইম: ২০-২০-২০ নিয়মে চোখ বাঁচান
ঢাকার অফিসের ল্যাপটপ থেকে গভীর রাতে বিছানায় ফেসবুক স্ক্রলিং — গড়পড়তা বাংলাদেশি এখন দিনের অনেকটা সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। চোখের ডাক্তারদের কাছে ক্লান্ত, জ্বালাপোড়া করা চোখ আর মাথাব্যথার রোগী — এমনকি স্কুলপড়ুয়া শিশুরাও — দিন দিন বাড়ছে। এর নাম ডিজিটাল আই স্ট্রেইন (কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম), আর সুখবর হলো কয়েকটি সহজ অভ্যাসেই এর বেশিরভাগ ঠেকানো যায়।
চোখের ক্লান্তির লক্ষণগুলো কেমন?
সাধারণ অভিযোগগুলো হলো চোখ শুকনো লাগা, জ্বালাপোড়া বা চুলকানি, বিকেল-সন্ধ্যায় ঝাপসা দেখা, পানি পড়া এবং কপালে বা চোখের পেছনে ভোঁতা মাথাব্যথা। স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে বসার কারণে অনেকের ঘাড় ও কাঁধেও ব্যথা হয়। লক্ষণগুলো সারাদিনে ধীরে ধীরে বাড়ে আর বিশ্রামে কমে — এটাই সাধারণ চোখের ক্লান্তিকে জটিল চোখের রোগ থেকে আলাদা করে।
স্ক্রিনে চোখ এত ক্লান্ত হয় কেন?
মূল কারণ চোখের পলক — বলা ভালো, পলক না পড়া। স্বাভাবিকভাবে আমরা মিনিটে ১৫-২০ বার পলক ফেলি, কিন্তু স্ক্রিনে মনোযোগ দিলে তা অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসে, ফলে চোখ ভেজা রাখার পানির পর্দা শুকিয়ে যায়। সঙ্গে ছোট ফন্ট, আলোর প্রতিফলন, খুব কাছে ধরা ফোন আর ফ্যানের শুকনো বাতাস — সব মিলিয়ে চোখের পেশিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাড়তি খাটুনি খাটতে হয়।
২০-২০-২০ নিয়মটা কী?
প্রতি ২০ মিনিট পর পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট (৬ মিটার) দূরের কিছুর দিকে তাকান। এতে চোখের ফোকাস করার পেশি বিশ্রাম পায় আর স্বাভাবিক পলক ফিরে আসে। প্রথম কয়েক সপ্তাহ ফোনে রিমাইন্ডার দিয়ে রাখুন; জানালা দিয়ে দূরের দালান বা গাছের দিকে তাকালেই চলবে।
পাঁচ মিনিটে স্ক্রিন ঠিকঠাক করে নিন
- দূরত্ব: মনিটর রাখুন প্রায় এক হাত (৫০-৬৫ সেমি) দূরে; ফোন চোখ থেকে অন্তত ৩০-৪০ সেমি দূরে ধরুন।
- উচ্চতা: স্ক্রিনের ওপরের প্রান্ত চোখ বরাবর বা সামান্য নিচে, যেন দৃষ্টি হালকা নিচের দিকে থাকে।
- উজ্জ্বলতা: ঘরের আলোর সঙ্গে স্ক্রিনের ব্রাইটনেস মিলিয়ে নিন; অন্ধকার ঘরে স্ক্রিন নয়, সন্ধ্যার পর নাইট মোড ব্যবহার করুন।
- ফন্ট: ঝুঁকে না পড়ে লেখার আকার বড় করে নিন।
- প্রতিফলন: জানালা বা বাতির আলো যেন স্ক্রিনে না পড়ে, সেভাবে বসুন।
সচেতনভাবে পলক ফেলুন, দরকারে কৃত্রিম অশ্রু
স্ক্রিনে কাজের ফাঁকে ইচ্ছা করে পুরো পলক ফেলার অভ্যাস করুন। শুকনোভাব না কমলে প্রিজারভেটিভমুক্ত লুব্রিকেটিং আই ড্রপ (কৃত্রিম অশ্রু) দিনে কয়েকবার সাধারণত নিরাপদ — সঠিক ড্রপটি ফার্মাসিস্ট বা ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন; প্রচলিত ওষুধগুলোর তথ্য পাবেন আমাদের ওষুধের ডিরেক্টরিতে।
কনটাক্ট লেন্স পরলে
লেন্স পরে স্ক্রিনে কাজ করলে চোখ আরও দ্রুত শুকায়। লেন্স পরে কখনো ঘুমাবেন না, পরিষ্কারের নিয়ম কঠোরভাবে মানুন, আর লম্বা স্ক্রিন-সেশনে বা চোখ খচখচ করলে চশমায় ফিরে যান।
শিশুদের জন্য কতটুকু স্ক্রিন টাইম নিরাপদ?
শিশু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বেশ রক্ষণশীল: ২ বছরের নিচে বিনোদনের জন্য স্ক্রিন একেবারেই নয়, ২-৫ বছরে অভিভাবকের সঙ্গে দিনে বড়জোর এক ঘণ্টা, আর স্কুলপড়ুয়াদের জন্য বাঁধা নিয়ম ও নিয়মিত খোলা জায়গায় খেলা। বাংলাদেশে শিশুদের মায়োপিয়া (চোখের পাওয়ারের সমস্যা) দ্রুত বাড়ছে বলে প্রতিদিন বাইরে খেলার সময়টা বিশেষ জরুরি। শোবার ঘরে স্ক্রিন রাখবেন না এবং ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ডিভাইস বন্ধ করুন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
এসব অভ্যাসের পরও দুই-তিন সপ্তাহ ধরে জ্বালাপোড়া, ঝাপসা দেখা বা মাথাব্যথা চলতে থাকলে চোখ পরীক্ষা করান — অনেক সময় চশমার পাওয়ারের ছোট্ট পরিবর্তনই সমাধান। ৪০ পেরোলে এমনিতেই প্রতি এক-দুই বছরে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত, কারণ গ্লকোমা ও ছানি নীরবে আসে; ডায়াবেটিস থাকলে বছরে একবার রেটিনা পরীক্ষা জরুরি (পড়ুন আমাদের ডায়াবেটিস গাইড)। কয়েক মিনিটেই চেম্বারবিডিতে যাচাই করা চক্ষু বিশেষজ্ঞের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে পারেন।
নিচের যেকোনোটি দেখা দিলে দেরি না করে চক্ষু বিশেষজ্ঞ বা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান:
- এক বা দুই চোখে হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া বা অন্ধকার দেখা।
- চোখে নতুন আলোর ঝলকানি, ভাসমান কালো দাগের ঝাঁক, বা দৃষ্টির একপাশে পর্দার মতো ছায়া।
- তীব্র চোখব্যথা, লাল চোখের সঙ্গে বমি, বা চোখ নাড়ালে ব্যথা।
- চোখে রাসায়নিক ছিটকে পড়া বা যেকোনো আঘাত।
- হঠাৎ দুটো করে দেখা বা চোখের পাতা ঝুলে পড়া।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।