শিশুদের কৃমি: লক্ষণ, কৃমিনাশক খাওয়ানোর নিয়ম ও প্রতিরোধ
বাংলাদেশের যেকোনো স্কুলশিক্ষক বা স্বাস্থ্যকর্মীকে জিজ্ঞেস করলে একই উত্তর পাবেন: শিশুদের সবচেয়ে সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি হলো কৃমি। গোলকৃমি, বক্রকৃমি (হুকওয়ার্ম), সুতাকৃমি ও চাবুককৃমি — এসব অন্ত্রের কৃমি নীরবে বেড়ে ওঠা শিশুর পুষ্টি কেড়ে নেয়; ফলে দেখা দেয় খাওয়ায় অরুচি, বৃদ্ধি কমে যাওয়া, ক্লাসে ঝিমুনি আর রক্তশূন্যতা। সুখবর হলো, একটি মাত্র ট্যাবলেটেই কৃমির চিকিৎসা হয় এবং প্রতিদিনের সহজ অভ্যাসে এটি অনেকটাই প্রতিরোধযোগ্য — এ জন্যই দেশে স্কুলশিশুদের জন্য বিনামূল্যে জাতীয় কৃমিনাশক কর্মসূচি চালু আছে।
শিশুরা কৃমিতে আক্রান্ত হয় কীভাবে?
বেশিরভাগ কৃমি ছড়ায় মাটি ও মলের দূষণের মাধ্যমে। আক্রান্ত ব্যক্তির মলের সঙ্গে বেরোনো কৃমির ডিম মাটি, পানি, শাকসবজি ও হাতে পৌঁছায় — তারপর না-ধোয়া হাত, ভালোভাবে না-ধোয়া কাঁচা শাকসবজি আর অনিরাপদ পানির মাধ্যমে আরেকজনের মুখে ঢোকে। হুকওয়ার্মের লার্ভা আবার দূষিত মাটিতে খালি পায়ে হাঁটা শিশুর পায়ের চামড়া ভেদ করেও ঢুকতে পারে। খোলা জায়গায় মলত্যাগ, ঘনবসতি আর মাটিতে খেলাধুলা — সবই ঝুঁকি বাড়ায়; এ কারণেই আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি শিশু কোনো না কোনো সময় কৃমির সংস্পর্শে আসে।
শিশুর কৃমি হয়েছে বুঝবেন কোন লক্ষণে?
আক্রান্ত অনেক শিশুকে দেখে কিছুই বোঝা যায় না — ঠিক এ কারণেই নিয়মিত কৃমিনাশক খাওয়ানো জরুরি। লক্ষণ দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় নাভির চারপাশে পেটব্যথা, রাতে মলদ্বারের চারপাশে চুলকানি (সুতাকৃমির বৈশিষ্ট্য), খাওয়ায় অরুচি ও ওজন না বাড়া। বেশি কৃমি থাকলে রক্তশূন্যতা হয় — শিশু ফ্যাকাশে দেখায়, সহজে ক্লান্ত হয়, পড়ায় মনোযোগ কমে যায়।
- বারবার পেটব্যথা, পেট ফাঁপা বা থেমে থেমে পাতলা পায়খানা
- মলদ্বারে চুলকানি, বিশেষত রাতে, সঙ্গে ঘুমের ব্যাঘাত
- খাওয়ায় অরুচি, ওজন কমা বা প্রত্যাশামতো না বাড়া
- ফ্যাকাশে ভাব ও সহজে ক্লান্তি — ফ্যাকাশে, দুর্বল শিশুকে কী খাওয়াবেন জানতে পড়ুন রক্তশূন্যতা ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার লেখাটি
- কখনও কখনও পায়খানা বা বমির সঙ্গে চোখে দেখা যাওয়া কৃমি
কৃমিনাশক কত দিন পরপর খাওয়াবেন?
বাংলাদেশে শিশুদের প্রতি ছয় মাস পরপর কৃমিনাশক খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়, আর এ জন্যই জাতীয় কর্মসূচিতে বছরে দুবার স্কুলে বিনামূল্যে ট্যাবলেট দেওয়া হয়। এসব ট্যাবলেট নিরাপদ, কার্যকর এবং এক ডোজেই খাওয়া হয়; সাধারণত এক-দুই বছর বয়স থেকে ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শমতো শুরু করা যায়। আরেকটি জরুরি কথা: বড়দেরসহ পুরো পরিবার একসঙ্গে কৃমিনাশক খান — নইলে পরিবারের সদস্যরা একে অপরকে বারবার সংক্রমিত করতে থাকেন।
নিজে থেকে ঘন ঘন বাড়তি ডোজ খাওয়াবেন না, আর এক বছরের কম বয়সী শিশু বা গর্ভবতী সদস্যকে কৃমিনাশক দেওয়ার আগে অবশ্যই জিজ্ঞেস করে নিন। একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকই সঠিক পরামর্শ দেবেন — চেম্বারবিডিতে শিশু বিশেষজ্ঞ খুঁজে নিতে পারেন; প্রচলিত কৃমিনাশক ওষুধের তথ্য পাবেন আমাদের ওষুধ ডিরেক্টরিতে।
কৃমি প্রতিরোধ করবেন কীভাবে?
প্রতিরোধ মানে মাটি-থেকে-মুখ পর্যন্ত সংক্রমণের চক্রটা প্রতিটি ধাপে ভেঙে দেওয়া। কৃমিনাশক আজকের কৃমি মারে, কিন্তু পরিচ্ছন্ন অভ্যাসই কেবল কালকের নতুন সংক্রমণ ঠেকায়।
- টয়লেটের পরে, বাইরে খেলার পরে এবং খাওয়া বা রান্নার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া
- শিশুর নখ ছোট ও পরিষ্কার রাখা — লম্বা নখের ফাঁকে ডিম লুকিয়ে খাবারের সঙ্গে মুখে যায়
- স্যান্ডেল বা জুতা পরার অভ্যাস করানো, বিশেষত মাটি, মাঠ ও টয়লেটের আশপাশে
- কাঁচা শাকসবজি ও ফল নিরাপদ পানিতে ভালো করে ধোয়া; সম্ভব হলে সবজি ভালোভাবে রান্না করা
- নিরাপদ পানি পান — ফুটানো, ফিল্টার করা বা পরীক্ষিত নলকূপের পানি
- সব সময় স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার ও তা পরিষ্কার রাখা; বাড়ির আশপাশে খোলা মলত্যাগ নয়
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
নিয়মিত কৃমিনাশক স্কুল কর্মসূচি বা ছোট্ট একটি পরামর্শেই হয়ে যায়, কিন্তু কিছু পরিস্থিতিতে আরেকটা ট্যাবলেট নয়, দরকার ভালোভাবে ডাক্তারি পরীক্ষা। পায়খানা বা বমিতে কৃমি দেখলে, পেটব্যথা তীব্র হলে বা বারবার ফিরে এলে, কিংবা খাওয়ার পরও শিশুর ওজন কমতে থাকলে ডাক্তার দেখান। খুব ফ্যাকাশে, ফোলা বা দুর্বল শিশুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রক্ত পরীক্ষা দরকার, কারণ চিকিৎসা না হলে ভারী সংক্রমণ থেকে মারাত্মক রক্তশূন্যতা ও অপুষ্টি হতে পারে।
- পায়খানা বা বমিতে কৃমি দেখা, কিংবা নাক-মুখ দিয়ে কৃমি বের হওয়া
- তীব্র বা লেগে থাকা পেটব্যথা, কিংবা পেট ফুলে যাওয়া ও ছুঁলেই ব্যথা
- পায়খানার সঙ্গে রক্ত, চলতে থাকা ডায়রিয়া বা বারবার বমি
- ওজন কমা, বৃদ্ধি থেমে যাওয়া, কিংবা স্পষ্ট ফ্যাকাশে ভাব ও দুর্বলতা
- রাতের চুলকানির সঙ্গে মলদ্বারের চারপাশের চামড়া ছিলে গিয়ে সংক্রমণ, যা সারছে না
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।