নারীদের প্রস্রাবে সংক্রমণ (UTI): কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, আধা ঘণ্টা পরপর টয়লেটে দৌড়, তলপেটে ভার ভার ব্যথা—নারীদের সবচেয়ে সাধারণ সংক্রমণগুলোর একটি হলো প্রস্রাবে সংক্রমণ বা ইউটিআই (UTI)। বাংলাদেশে অনেকে লজ্জায় বিষয়টি চেপে যান, নয়তো ফার্মেসি থেকে দু-চারটা ক্যাপসুল খেয়ে ভালো হয়ে যাওয়ার আশা করেন। অথচ ইউটিআই খুবই নিরাময়যোগ্য; ভুল চিকিৎসায় এটি বারবার ফিরে আসে, আর অবহেলা করলে সংক্রমণ উঠে যেতে পারে কিডনি পর্যন্ত।
নারীদের ইউটিআই বেশি হয় কেন?
মূল কারণ শারীরিক গঠন: নারীদের মূত্রনালি (urethra) পুরুষের চেয়ে অনেক খাটো এবং পায়ুপথের কাছাকাছি, তাই ই-কোলাই (E. coli)-এর মতো অন্ত্রের জীবাণু সহজেই মূত্রথলিতে পৌঁছে যায়। যৌন সক্রিয়তা, গর্ভাবস্থা, ডায়াবেটিস, মেনোপজ এবং দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখার অভ্যাসে ঝুঁকি আরও বাড়ে। কম পানি খেলে—অফিসের ব্যস্ততা, লম্বা জার্নি বা রোজায় যা প্রায়ই হয়—প্রস্রাব ঘন হয়ে জীবাণু বাড়ার সুযোগ পায়।
ইউটিআই-এর লক্ষণগুলো কী কী?
মূত্রথলির সংক্রমণ সাধারণত বেশ স্পষ্টভাবেই জানান দেয়; শুরুতেই চিনতে পারলে চিকিৎসা দ্রুত হয়, কষ্টও কমে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
- প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা
- ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ, কিন্তু প্রতিবার অল্প পরিমাণে হওয়া
- হঠাৎ এমন তীব্র বেগ যে আটকে রাখা কঠিন
- তলপেটে ব্যথা বা ভার ভার লাগা
- ঘোলাটে বা দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব, কখনো কখনো সঙ্গে রক্ত
এর সঙ্গে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর, পিঠ বা কোমরের পাশে ব্যথা, বমিভাব বা বমি যোগ হলে ধরে নিতে হবে সংক্রমণ কিডনিতে পৌঁছে গেছে—এটা জরুরি অবস্থা, ঘরে বসে সামলানোর বিষয় নয়।
সঠিক নিয়মে পরীক্ষা ও চিকিৎসা
সম্ভব হলে অ্যান্টিবায়োটিক শুরুর আগেই প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা (urine R/E) এবং কালচার ও সেনসিটিভিটি টেস্ট করিয়ে নিন—কালচারেই বোঝা যায় ঠিক কোন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে। এরপর ডাক্তারের দেওয়া পূর্ণ কোর্স শেষ করুন; এক-দুই দিনে আরাম লাগলেও ওষুধ বন্ধ করবেন না। অর্ধেক কোর্স, পুরোনো প্রেসক্রিপশন আবার ব্যবহার, বা ফার্মেসি থেকে আন্দাজে দু-তিনটা ক্যাপসুল—এভাবেই তৈরি হয় প্রতিরোধী জীবাণু, যা পরেরবার আর সহজে সারে না; বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এভাবেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে প্রচুর পানি খান, ব্যথা-অস্বস্তিতে ডাক্তারের পরামর্শমতো প্যারাসিটামল নিতে পারেন; প্রেসক্রিপশনের ওষুধগুলো চেম্বারবিডির ওষুধ ডিরেক্টরিতে দেখে নেওয়া যায়।
ইউটিআই প্রতিরোধে কী করবেন?
প্রতিদিনের কিছু সহজ অভ্যাসই বড় অংশের ইউটিআই—বিশেষ করে বারবার ফিরে আসা সংক্রমণ—ঠেকাতে পারে। রুটিনে যোগ করুন:
- দিনে ৮-১০ গ্লাস পানি খান এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রস্রাব চেপে রাখবেন না
- সহবাসের পরপরই প্রস্রাব করে নিন
- টয়লেটের পর সবসময় সামনে থেকে পেছনের দিকে পরিষ্কার করুন
- সুতির অন্তর্বাস পরুন ও প্রতিদিন বদলান; গরমে আঁটসাঁট সিনথেটিক পোশাক এড়িয়ে চলুন
- গোপনাঙ্গে কড়া সাবান বা তথাকথিত ফেমিনিন ওয়াশ নয়—সাধারণ পানিই যথেষ্ট
- ডায়াবেটিস ও কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে রাখুন
বারবার ইউটিআই ও গর্ভাবস্থায় ইউটিআই
ছয় মাসে দুবার বা বছরে তিনবারের বেশি ইউটিআই হলে প্রতিবার শুধু ওষুধ খেয়ে থেমে যাবেন না—মূল কারণ খুঁজতে ডাক্তারের কাছে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা চান; এতে আলট্রাসাউন্ড, রক্তের সুগার পরীক্ষা ও অভ্যাস পর্যালোচনা থাকতে পারে। গর্ভাবস্থায় ইউটিআই বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার: লক্ষণহীন সংক্রমণও কিডনি সংক্রমণ বা সময়ের আগে প্রসবের কারণ হতে পারে; এ জন্যই এএনসি ভিজিটে প্রস্রাব পরীক্ষা করা হয়। গর্ভবতী নারী প্রস্রাবের যেকোনো সমস্যা সেদিনই ডাক্তারকে জানাবেন এবং শুধু গর্ভাবস্থায় নিরাপদ অ্যান্টিবায়োটিক, পূর্ণ কোর্সে খাবেন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
জ্বালাপোড়া বা ঘন ঘন প্রস্রাব এক-দুই দিনের বেশি থাকলে, প্রস্রাবে রক্ত দেখলে, কিংবা আপনি গর্ভবতী, ডায়াবেটিক বা ষাটোর্ধ্ব হলে নিজে নিজে চিকিৎসা না করে দ্রুত ডাক্তার দেখান। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর, পিঠ-কোমরে ব্যথা, বারবার বমি, বা পরিবারের বয়স্ক কারও হঠাৎ এলোমেলো কথা বলা দেখলে সেদিনই হাসপাতালে যান—কিডনির সংক্রমণ খুব দ্রুত মারাত্মক হতে পারে। গাইনি, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা ইউরোলজিস্ট—প্রয়োজন অনুযায়ী চেম্বারবিডিতে ভেরিফায়েড ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন; আগের প্রস্রাব পরীক্ষার রিপোর্টগুলো সঙ্গে নিয়ে যান।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।