ChamberBD Logo ChamberBD
See in English

অপরিণত শিশুর যত্ন: উষ্ণতা, খাওয়ানো ও ফলোআপ

গর্ভধারণের ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই জন্ম নেওয়া শিশুকে অপরিণত বা প্রি-টার্ম শিশু বলা হয়, আর বাংলাদেশে এমন ছোট্ট শিশুর জন্ম খুবই সাধারণ ঘটনা। শরীর পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই জন্মানোয় তারা দ্রুত শরীরের তাপ হারায়, খাওয়ার সময় সহজেই ক্লান্ত হয় এবং পূর্ণ-মেয়াদি শিশুর তুলনায় সহজে সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। ভালো খবর হলো, উষ্ণতা, বারবার বুকের দুধ আর নিয়মিত ফলোআপ পেলে বেশিরভাগ অপরিণত শিশুই সম্পূর্ণ সুস্থভাবে বড় হয়। ঘরে কীভাবে যত্ন নিতে হয় তা জানলে শিশুটি সবচেয়ে ভালো শুরুটা পায়।

অপরিণত শিশুর সবচেয়ে বেশি কী দরকার?

একটি প্রি-টার্ম শিশুর তিনটি মৌলিক চাহিদা থাকে, যা পরিবার প্রতিদিন ঘরেই পূরণ করতে পারে: উষ্ণ থাকা, পর্যাপ্ত বুকের দুধ পাওয়া এবং সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা। যেহেতু তাদের শরীরের চর্বি ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনো গড়ে উঠছে, তাই উষ্ণতা বা পরিচ্ছন্নতায় সামান্য ঘাটতিতেও তারা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। ডাক্তার শিশুকে বাসায় আনার অনুমতি দিলে আপনার নিয়মিত যত্নই হয়ে ওঠে সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধ।

ক্যাঙারু মাদার কেয়ার: ত্বকে-ত্বকে উষ্ণতা

ক্যাঙারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) অপরিণত শিশুকে উষ্ণ রাখার অন্যতম নিরাপদ ও কার্যকর উপায়, আর বাংলাদেশে এটি বিশেষভাবে পরামর্শ করা হয়। শুধু ন্যাপি ও টুপি পরিয়ে শিশুকে মা বা বাবার খোলা বুকের সঙ্গে খাড়াভাবে ধরে রাখা হয় এবং কাপড় বা চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এই ত্বকে-ত্বকে স্পর্শ শিশুর শরীরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখে, শ্বাস ও হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক রাখে এবং বুকের দুধ খাওয়াতে সাহায্য করে।

  • দিনে যত বেশি সময় সম্ভব শিশুকে ত্বকে-ত্বকে ধরে রাখুন, বিশ্রাম বা খাড়া হয়ে ঘুমানোর সময়ও।
  • ঘর উষ্ণ ও ঠান্ডা বাতাসমুক্ত রাখুন এবং শিশুর মাথায় নরম টুপি পরান।
  • মা বিশ্রাম নেওয়ার সময় বাবা বা দাদি-নানিও ক্যাঙারু কেয়ার দিতে পারেন।
  • শিশুর হাত, পা ও বুক উষ্ণ লাগছে কিনা দেখুন—ঠান্ডা বা গরম যেন না হয়।

অপরিণত শিশুকে খাওয়ানো

অপরিণত শিশুর জন্য বুকের দুধই সবচেয়ে উপযুক্ত, কারণ এটি সহজে হজম হয় ও সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। প্রি-টার্ম শিশু ধীরে দুধ খায় এবং খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়তে পারে, তাই দিনে-রাতে সাধারণত প্রতি দুই-তিন ঘণ্টা পরপর অল্প অল্প করে বারবার খাওয়াতে হয়। শিশু যদি এখনো ভালোভাবে চুষতে না পারে, মা বুকের দুধ চেপে বের করে পরিষ্কার চামচ বা ছোট কাপে পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়াতে পারেন। যথাসম্ভব ফিডার বোতল এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করা কঠিন ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

ভেজা ন্যাপির সংখ্যা ও ওজন বাড়া খেয়াল রাখুন, কারণ এগুলো বোঝায় শিশু পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে। খাওয়া ঠিকঠাক শুরু হলে ডাক্তার ভিটামিন ডি, আয়রন ড্রপ বা অন্যান্য সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন; কখনো নিজে থেকে কোনো ওষুধ শুরু করবেন না।

ঘরে সংক্রমণ প্রতিরোধ

অপরিণত শিশু সংক্রমণে খুব সহজে আক্রান্ত হয়, তাই সাধারণ পরিচ্ছন্নতাই অনেক বড় ভূমিকা রাখে। শিশুকে ছোঁয়ার আগে সবাইকে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। দর্শনার্থী যথাসম্ভব কম রাখুন, বিশেষ করে যাদের কাশি, জ্বর বা সর্দি আছে। শিশুকে ভিড়, ধোঁয়া ও ধুলো থেকে দূরে রাখুন এবং তার জামাকাপড় ও বিছানা পরিষ্কার রেখে রোদে শুকান। ইপিআই টিকার সময়সূচি ঠিক সময়ে মেনে চলুন; অপরিণত শিশুদের সাধারণত তাদের প্রকৃত জন্মতারিখ অনুযায়ী টিকা দেওয়া হয়।

কখন দ্রুত ডাক্তারের কাছে ছুটবেন?

অপরিণত শিশু খুব দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, তাই কিছু অস্বাভাবিক মনে হলে দেরি করবেন না। নিচের যেকোনো বিপদচিহ্ন দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিন:

  • শ্বাস নিতে কষ্ট, দ্রুত শ্বাস, বা প্রতি শ্বাসে বুক ভেতরে দেবে যাওয়া।
  • ক্যাঙারু কেয়ার দেওয়ার পরও শরীর ঠান্ডা থাকা, অথবা জ্বর।
  • দুধ খেতে না চাওয়া, অনেক কম খাওয়া, বা বারবার বমি।
  • ত্বক বা চোখ হলুদ (জন্ডিস) হয়ে যাওয়া, যা ছড়াচ্ছে বা বাড়ছে।
  • অস্বাভাবিকভাবে নিস্তেজ, নেতিয়ে পড়া, বা ডেকে তোলা কঠিন।
  • খিঁচুনি, অথবা ঠোঁট ও জিভ নীল হয়ে যাওয়া।

এই লক্ষণগুলো মানে শিশুর তখনই চিকিৎসা দরকার। শিশু বিশেষজ্ঞ খুঁজে নিতে পারেন আমাদের নিবন্ধিত ডাক্তারের তালিকা থেকে, আর শিশু সুস্থ মনে হলেও ফলোআপের সময়গুলো অবশ্যই রাখুন। নির্ধারিত যেকোনো ড্রপ বা সাপ্লিমেন্ট দোকানের পরামর্শে না কিনে মেডিসিন ডিরেক্টরিতে যাচাই করে নিন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

অপরিণত শিশুর কতদিন বাড়তি যত্ন দরকার?

এটি নির্ভর করে শিশু কত আগে জন্মেছে ও তার ওজনের ওপর। বেশিরভাগ শিশুর পূর্ণ-মেয়াদি শিশুর ওজন ও খাওয়ার সক্ষমতা না আসা পর্যন্ত নিবিড় যত্ন দরকার, প্রায়ই প্রথম কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস। ডাক্তার ফলোআপ ভিজিট ও কখন বিশেষ সতর্কতা শিথিল করা যায় তা জানিয়ে দেবেন।

অপরিণত শিশুকে কি ফর্মুলা বা অন্য খাবার দেওয়া যায়?

বুকের দুধই সবচেয়ে ভালো। ফর্মুলা কেবল ডাক্তার পরামর্শ দিলে ব্যবহার করুন, আর ছোট শিশুকে পানি, মধু, সরিষার তেল বা শক্ত খাবার দেওয়া যাবে না। ডাক্তার অন্য খাবার শুরু করতে না বলা পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ চালিয়ে যান, যা সাধারণত সংশোধিত বয়স ছয় মাস হলে।

ঘরে ক্যাঙারু কেয়ার দেওয়া কি নিরাপদ?

হ্যাঁ। শিশু স্থিতিশীল হয়ে ছাড়া পেলে ঘরে ক্যাঙারু মাদার কেয়ার নিরাপদ, বিনামূল্যের ও খুবই কার্যকর। এটি শিশুকে উষ্ণ রাখে, বুকের দুধ খাওয়াতে সাহায্য করে এবং ওজন বাড়াতেও সহায়ক, তাই যতক্ষণ আরামে পারেন ততক্ষণ দিন।

আমার অপরিণত শিশু কবে অন্য শিশুদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেবে?

অনেক অপরিণত শিশু প্রথম এক-দুই বছরের মধ্যে বৃদ্ধি ও বিকাশে তাল মিলিয়ে নেয়। ডাক্তার সংশোধিত বয়স (প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ থেকে গোনা বয়স) দিয়ে অগ্রগতি মাপেন, তাই পূর্ণ-মেয়াদি শিশুর চেয়ে মাইলফলক একটু দেরিতে এলে দুশ্চিন্তা করবেন না।

শিশুর ভিজিটের জন্য আমাদের ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল দিয়ে বিনামূল্যে প্রেসক্রিপশন রেকর্ড তৈরি করতে পারেন, আর আরও অভিভাবকত্ব ও শিশু-স্বাস্থ্যের লেখা পড়ুন আমাদের স্বাস্থ্য টিপস সংগ্রহে।

এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়, শিশুর বিষয়ে সবসময় যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

এই তথ্যটি কি আপনার কাজে লেগেছে?