ChamberBD Logo ChamberBD
See in English

লিভার সিরোসিস: কারণ, লক্ষণ ও যত্ন

লিভার শরীরের অন্যতম পরিশ্রমী অঙ্গ—নীরবে রক্ত পরিষ্কার করে, শক্তি জমিয়ে রাখে এবং হজমে সাহায্য করে। সিরোসিস এমন একটি অবস্থা, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ফলে সুস্থ লিভার টিস্যুর জায়গায় ক্ষতচিহ্ন (স্কার) তৈরি হয়, ফলে অঙ্গটি ধীরে ধীরে কাজ করার ক্ষমতা হারায়। বাংলাদেশে এর সবচেয়ে সাধারণ কারণ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের সঙ্গে যুক্ত ফ্যাটি লিভার এবং দীর্ঘদিন মদ্যপান। সিরোসিস যত আগে ধরা পড়ে, তত বেশি কিছু করা যায়—রোগের গতি ধীর করা ও বিপজ্জনক জটিলতা ঠেকানো। এর অনেক কারণই আবার প্রতিরোধযোগ্য।

লিভার সিরোসিস কী?

বছরের পর বছর লিভার বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে সিরোসিস হয়। নিজেকে সারানোর চেষ্টায় ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয়ে শক্ত হয়ে যায়, ভেতরের রক্তনালীগুলো চেপে ধরে স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দেয়। প্রথম ধাপে, যাকে কম্পেনসেটেড সিরোসিস বলে, লিভার তখনও সামলে নেয় এবং উপসর্গ কম থাকতে পারে। পরের ধাপে, ডিকম্পেনসেটেড অবস্থায়, লিভার আর পেরে ওঠে না এবং গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। আগেভাগে কারণ চিহ্নিত করলে বাকি লিভারের কাজ রক্ষার সবচেয়ে ভালো সুযোগ মেলে।

সতর্ক-সংকেত কী কী?

প্রাথমিক সিরোসিসে কেবল অস্পষ্ট ক্লান্তি থাকতে পারে, তবে বাড়লে যা লক্ষ্য করতে পারেন:

  • চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)।
  • পেট ফুলে যাওয়া (অ্যাসাইটিস) কিংবা পা ও পায়ের পাতা ফোলা।
  • সহজে কালশিটে পড়া বা রক্তপাত, মাড়ি বা নাক থেকেও।
  • একটানা ক্লান্তি, দুর্বলতা ও খাবারে অরুচি।
  • ত্বকে চুলকানি ও গাঢ় রঙের প্রস্রাব।
  • বেড়ে গেলে বিভ্রান্তি, মনোযোগের অভাব বা ঘুমের গোলযোগ।

সিরোসিসের কারণ কী?

কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা লিভারে ক্ষত তৈরি করতে পারে। আমাদের অঞ্চলে প্রধান কারণগুলো হলো ক্রনিক হেপাটাইটিস বি ও সি, যা প্রায়ই নীরবে ছড়ায়; স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও অস্বাস্থ্যকর খাবারজনিত ফ্যাটি লিভার; এবং নিয়মিত মদ্যপান। কম ক্ষেত্রে কিছু বংশগত রোগ ও কিছু দীর্ঘমেয়াদি ওষুধও দায়ী হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—হেপাটাইটিস বি জাতীয় ইপিআই সূচির টিকা দিয়ে প্রতিরোধযোগ্য এবং হেপাটাইটিস সি এখন ওষুধে সারে, তাই পরীক্ষা ও আগেভাগে চিকিৎসা জরুরি। লিভার রক্ষা ও হেপাটাইটিস প্রতিরোধে আরও স্বাস্থ্য টিপস পড়তে পারেন।

সিরোসিসে ঘরে কীভাবে যত্ন নেবেন?

সিরোসিস ফেরানো যায় না, তবে সঠিক যত্ন এর গতি ধীর করে বছরের পর বছর সুস্থ রাখতে পারে। কার্যকর পদক্ষেপ:

  • মদ্যপান পুরোপুরি বন্ধ করুন এবং অপ্রয়োজনীয় বা প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ এড়িয়ে চলুন।
  • হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসা নিন এবং বাড়ির লোকদের হেপাটাইটিস বি টিকা দিন।
  • পর্যাপ্ত প্রোটিন ও শক্তি নিন, অল্প অল্প করে বারবার খান; ফোলা থাকলে লবণ কমান।
  • কাঁচা বা আধাসিদ্ধ শামুক-ঝিনুক ও সংক্রমণ ঘটাতে পারে এমন রাস্তার খাবার এড়িয়ে চলুন।
  • কেবল ডাক্তারের অনুমোদিত ওষুধ নিন; কিছু সাধারণ ব্যথানাশক লিভারের ক্ষতি করতে পারে, তাই প্যারাসিটামল-এর মতো ওষুধের মাত্রা ডাক্তারের সঙ্গে যাচাই করুন।

চিকিৎসা গোছানো রাখুন; ক্লিনিকে যাওয়ার সময় ওষুধের তালিকা রাখতে ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল সাহায্য করতে পারে।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

চোখ হলুদ হলে, একটানা ক্লান্তি বা পেট ফোলা থাকলে, কিংবা আগে থেকে হেপাটাইটিস বা ফ্যাটি লিভার থাকলে ডাক্তার দেখান। রক্ত বমি বা কালো পায়খানা, শ্বাসকষ্টসহ পেট মারাত্মক ফুলে যাওয়া, কিংবা নতুন বিভ্রান্তি, ঝিমুনি বা অস্বাভাবিক আচরণ হলে সঙ্গে সঙ্গে জরুরি চিকিৎসা নিন, কারণ এগুলো বিপজ্জনক জটিলতার ইঙ্গিত। যোগ্য লিভার বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ খুঁজে নিতে পারেন আমাদের নিবন্ধিত ডাক্তারের তালিকা থেকে। এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়, নিজের অবস্থার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

সিরোসিস কি সারে বা ফেরানো যায়?

একবার তৈরি হওয়া ক্ষত সাধারণত ফেরানো যায় না, তবে কারণের চিকিৎসা—যেমন হেপাটাইটিস সি সারানো বা মদ্যপান বন্ধ করা—রোগ বাড়া থামিয়ে বছরের পর বছর ভালো রাখতে পারে।

সিরোসিস কি শুধু যারা মদ্যপান করেন তাদের হয়?

না। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে এটি হয় হেপাটাইটিস বি, সি কিংবা স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের সঙ্গে যুক্ত ফ্যাটি লিভার থেকে। যারা কখনো মদ্যপান করেন না, তাদেরও সিরোসিস হতে পারে।

সিরোসিসে কি বিশেষ খাদ্য দরকার?

প্রায়ই হ্যাঁ। বেশিরভাগের পর্যাপ্ত প্রোটিন ও শক্তিসহ অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া দরকার, আর ফোলা থাকলে লবণ কম। আপনার ধাপ অনুযায়ী ডাক্তার বা পুষ্টিবিদ পরামর্শ ঠিক করে দেবেন।

হেপাটাইটিস বি টিকা কি লিভার রক্ষা করতে পারে?

হ্যাঁ। জাতীয় ইপিআই সূচির হেপাটাইটিস বি টিকা সিরোসিসের অন্যতম প্রধান কারণ প্রতিরোধ করে। হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত কারও পরিবারের সদস্যদেরও টিকা নেওয়া উচিত।

এই তথ্যটি কি আপনার কাজে লেগেছে?