হাঁটু ব্যথা ও আর্থ্রাইটিস: বয়স্কদের ব্যথা উপশম, ব্যায়াম ও যত্ন
বাংলাদেশে বয়স্কদের মধ্যে হাঁটু ব্যথা সবচেয়ে সাধারণ অভিযোগগুলোর একটি, আর অনেকের কাছে এটি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, মেঝেতে বসা বা নামাজ পড়ার মতো সাধারণ কাজগুলোকে কষ্টকর করে তোলে। এই ব্যথার বেশিরভাগই আসে অস্টিওআর্থ্রাইটিস থেকে, অর্থাৎ হাঁটুর তরুণাস্থির (কার্টিলেজ) ধীরে ধীরে ক্ষয় হওয়া থেকে। ভালো খবর হলো, সঠিক যত্নে বেশিরভাগ মানুষই ব্যথা কমিয়ে, সচল থেকে বহু বছর স্বাবলম্বী থাকতে পারেন। কী হাঁটুর উপকার করে আর কী ক্ষতি করে—তা বোঝা যেকোনো বয়সেই বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস কী?
অস্টিওআর্থ্রাইটিস সবচেয়ে সাধারণ ধরনের আর্থ্রাইটিস, যা তখন হয় যখন হাঁটুর জোড়ায় কুশনের মতো কাজ করা মসৃণ তরুণাস্থি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। এই কুশন না থাকায় হাড়ে হাড়ে ঘষা লাগে, ফলে ব্যথা, জড়তা, ফোলা এবং কড়মড় অনুভূতি হয়। বাংলাদেশে বয়স্ক মানুষ, নারী এবং অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিদের মধ্যে এটি বিশেষভাবে দেখা যায়। একে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা না গেলেও এর অগ্রগতি ধীর করা ও উপসর্গ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
হাঁটুর আর্থ্রাইটিস কী কারণে বাড়ে?
বাংলাদেশের ঘরে প্রচলিত কিছু অভ্যাস ক্ষয়ে যাওয়া হাঁটুর ওপর প্রচণ্ড চাপ ফেলে। প্যান-প্যানে (স্কোয়াটিং) টয়লেট ব্যবহার, দীর্ঘ সময় মেঝেতে পা ভাঁজ করে বসা এবং বারবার সিঁড়ি বেয়ে ওঠা—সবই জোড়ায় গভীর চাপ দেয়। অতিরিক্ত ওজন অন্যতম বড় কারণ, কারণ প্রতিটি বাড়তি কেজি প্রতি পদক্ষেপে হাঁটুর ওপর চাপ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই চাপগুলো কমালেই অনেক সময় লক্ষণীয় আরাম মেলে।
কোন উপশম সত্যিই কাজ করে?
সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসাগুলো সহজ এবং সবসময় ওষুধ লাগে না। কয়েক কেজি ওজন কমালেই হাঁটুর ওপর চাপ অনেকটা কমে, আর উরুর পেশি শক্তিশালী করলে জোড়া সাপোর্ট পায় ও সুরক্ষিত থাকে।
- সোজা পা তোলা: বসে বা শুয়ে এক পা সোজা রেখে ধীরে ধীরে তুলুন, কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখুন, তারপর নামান। দুই পায়েই করুন।
- বসে হাঁটু সোজা করা: চেয়ারে বসে ধীরে ধীরে এক হাঁটু সোজা করুন যতক্ষণ না পা সমান হয়, একটু ধরে রাখুন, তারপর শিথিল করুন।
- দেয়ালে ঠেস দিয়ে হালকা স্কোয়াট: দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁটু সামান্য ভাঁজ করে আবার সোজা হোন, গভীর ভাঁজ এড়িয়ে চলুন।
গরম সেঁক জড়তা কমায়, আর ফোলা ও ব্যথাযুক্ত হাঁটুতে ঠান্ডা সেঁক উপকারী। উল্টো হাতে ধরা লাঠি এবং উঁচু চেয়ার-কমোড ব্যবহারও চাপ কমাতে সাহায্য করে।
হাঁটু ব্যথায় ব্যথানাশক কি নিরাপদ?
ব্যথানাশক উপকার করতে পারে, তবে অনেকে যেমন ভাবেন এগুলো ততটা নিরীহ নয়। পরামর্শ ছাড়া কেনা সাধারণ প্রদাহনাশক ট্যাবলেট (এনএসএআইডি) পাকস্থলীতে জ্বালা ও কিডনির ক্ষতি করতে পারে, বিশেষ করে বয়স্ক বা আগে থেকে সমস্যা থাকা ব্যক্তিদের। তাই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত, যা ব্যাখ্যা করা আছে আমাদের কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ ও গ্যাস্ট্রিক ও অম্লতা লেখায়। নিয়মিত কোনো ব্যথানাশক খেলে তা সবসময় ডাক্তারকে জানান।
আপনার কি হাঁটু প্রতিস্থাপন দরকার?
হাঁটুর আর্থ্রাইটিসে ভোগা বেশিরভাগ মানুষেরই কখনও অস্ত্রোপচার লাগে না। হাঁটু প্রতিস্থাপন (নি রিপ্লেসমেন্ট) কেবল তীব্র, অগ্রসর আর্থ্রাইটিসে বিবেচনা করা হয়, যখন ব্যথা অবিরাম থাকে, চলাফেরা মারাত্মকভাবে সীমিত হয় এবং অন্য চিকিৎসা ব্যর্থ হয়। বেশিরভাগের জন্য নিয়মিত ফিজিওথেরাপি অনেক বেশি মূল্যবান—একজন প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্ট নিরাপদ ব্যায়াম শেখাতে, চলাচল উন্নত করতে ও ব্যথা কমাতে পারেন অস্ত্রোপচার ছাড়াই। অস্ত্রোপচার শেষ ধাপ, প্রথম নয়। সত্যিই দরকার হলে আধুনিক হাঁটু প্রতিস্থাপন নিরাপদ এবং ভালোভাবে চলাচল ফিরিয়ে আনতে পারে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
হাঁটু ব্যথা কয়েক সপ্তাহের বেশি থাকলে, রাতে ঘুম নষ্ট করলে, কিংবা দৈনন্দিন কাজ সীমিত করে দিলে ডাক্তার দেখান। হাঁটু গরম, লাল ও খুব ফোলা হলে, জোড়ার ব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকলে, হাঁটু হঠাৎ আটকে গেলে বা ভেঙে পড়ার মতো হলে, কিংবা পড়ে যাওয়া বা আঘাতের পর ব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন—এগুলোর জরুরি মনোযোগ লাগতে পারে। সঠিক মূল্যায়নের জন্য আমাদের নিবন্ধিত ডাক্তারের তালিকা থেকে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ ও ফিজিওথেরাপিস্ট খুঁজে নিতে পারেন।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।