ChamberBD Logo ChamberBD
Illustration of yellow eyes and liver explaining jaundice causes and tests

জন্ডিস: কারণ, ধরন, পরীক্ষা এবং ঝাড়ফুঁক-টোটকার আসল সত্য

হলদে চোখ, গাঢ় প্রস্রাব আর শরীরটা ম্যাজম্যাজ করা—জন্ডিস বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই পরিচিত। এ দেশে এটি খুবই সাধারণ, আর দুর্ভাগ্যবশত একে ঘিরে আছে নানা ভ্রান্ত ধারণা—ভেষজ গোসল থেকে শুরু করে সুতা-তাবিজ আর 'টোটকা' পর্যন্ত। জন্ডিস আসলে কী এবং সত্যিকার অর্থে কী উপকারে আসে তা বুঝলে বিপজ্জনক দেরি এড়ানো যায় এবং লিভার সুরক্ষিত থাকে।

জন্ডিস আসলে কী?

জন্ডিস নিজে কোনো রোগ নয়—এটি একটি লক্ষণ যে কোথাও, সাধারণত লিভারে, কিছু গন্ডগোল হয়েছে। পুরোনো লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে তৈরি হওয়া হলুদ রঞ্জক বিলিরুবিন যখন লিভার ঠিকমতো বের করতে পারে না, তখন তা রক্তে জমে যায়। এই বাড়তি বিলিরুবিন চোখের সাদা অংশ ও ত্বক হলুদ করে আর প্রস্রাব গাঢ় করে দেয়। এটি যেহেতু একটি লক্ষণ, আসল প্রশ্ন সবসময়ই—এর কারণটা কী?

বাংলাদেশে জন্ডিস কেন হয়?

এখানে বেশির ভাগ জন্ডিস হয় লিভার বা পিত্তপ্রবাহের সমস্যা থেকে। সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে আছে:

  • হেপাটাইটিস এ ও ই—অনিরাপদ পানি ও দূষিত খাবারে ছড়ানো ভাইরাল সংক্রমণ; বিশেষত বর্ষায় খুব সাধারণ।
  • হেপাটাইটিস বি ও সি—রক্ত ও দেহরসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগের বড় কারণ।
  • পিত্তথলির পাথর পিত্তনালি আটকে দিলে।
  • দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগ, যেমন ফ্যাটি লিভার ও সিরোসিস।
  • কিছু ওষুধ, বিষাক্ত পদার্থ এবং নবজাতকের ক্ষেত্রে লিভারের অপরিণত কার্যক্ষমতা।

ঝাড়ফুঁক আর ভেষজ 'টোটকা' কাজ করছে বলে মনে হয় কেন?

জন্ডিস নিয়ে এটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল ধারণা। সবচেয়ে সাধারণ কারণ—হেপাটাইটিস এ বা ই—আপনি যা-ই করুন না কেন, কয়েক সপ্তাহে সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়। তাই ভেষজ গোসল, সুতা বা ঝাড়ফুঁকের পর কেউ সুস্থ হলে মনে হয় 'টোটকা' কাজ করেছে, অথচ আসলে শরীর নিজেই সেরে উঠেছে। আসল ক্ষতি হলো এতে তৈরি হওয়া মিথ্যা আস্থা: পিত্তনালি বন্ধ বা হেপাটাইটিস বি-র মতো গুরুতর কারণে আক্রান্তরা মূল্যবান সময় হারান, আর কিছু ভেষজ 'লিভার টনিক' উল্টো লিভারের আরও ক্ষতি করে।

জন্ডিসের সঠিক চিকিৎসা ও পরীক্ষা কী?

চিকিৎসা পুরোপুরি কারণের ওপর নির্ভর করে, তাই প্রথম কাজ সঠিক রোগনির্ণয়। ডাক্তার সাধারণত বিলিরুবিন, লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT), ভাইরাল হেপাটাইটিস মার্কার এবং প্রায়ই লিভার ও পিত্তথলির আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করেন। সাধারণ ভাইরাল হেপাটাইটিসে চিকিৎসা মূলত সহায়ক: পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রচুর পানি ও তরল, আর সহজপাচ্য, তাজা রান্না করা কম তেলের খাবার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—অপ্রয়োজনীয় 'লিভার টনিক', ভেষজ মিশ্রণ ও দোকান থেকে কেনা ওষুধ এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো কষ্টে থাকা লিভারের ওপর বাড়তি চাপ ফেলে; মদ একেবারেই বর্জন করুন, আর চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বারবার প্যারাসিটামল বা ব্যথার ওষুধ খাবেন না।

নবজাতকের জন্ডিস নিয়ে কী জানা দরকার?

জন্মের প্রথম সপ্তাহে হালকা হলুদভাব সাধারণ, কারণ শিশুর লিভার তখনো অপরিণত, আর তা প্রায়ই নিজে থেকেই কমে যায়। তবে নবজাতকের জন্ডিস কখনো কখনো গুরুতরও হতে পারে, তাই বাড়িতে বসে বিচার করা যাবে না। হলুদ হয়ে যাওয়া যেকোনো নবজাতককে দ্রুত দেখান—বিশেষত শিশু ঠিকমতো দুধ না খেলে, খুব ঘুমিয়ে থাকলে, হলুদভাব গাঢ় হলে বা জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেখা দিলে।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

জন্ডিস দেখা দিলেই বাড়িতে চিকিৎসা না করে ডাক্তার দেখান। জরুরি ভিত্তিতে সাহায্য নিন যদি থাকে অস্বাভাবিক আচরণ বা অতিরিক্ত ঝিমুনি, রক্তপাত বা সহজে কালশিটে পড়া, বমি, পেটে তীব্র ব্যথা, খুব গাঢ় হলুদভাব, কিংবা গাঢ় প্রস্রাবের সঙ্গে ফ্যাকাশে মাটিরঙা পায়খানা—এগুলো গুরুতর লিভার সমস্যা বা পিত্তনালি বন্ধের ইঙ্গিত দিতে পারে। আমাদের ডাক্তার তালিকা থেকে যোগ্য বিশেষজ্ঞ খুঁজে নিতে পারেন। প্রতিরোধও শক্তিশালী: ফুটানো বা বিশুদ্ধ নিরাপদ পানি পান করুন, তাজা রান্না করা খাবার খান, ভালোভাবে হাত ধুন, আর নিরাপদ ও সহজলভ্য হেপাটাইটিস বি টিকা নিন।

এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

এই তথ্যটি কি আপনার কাজে লেগেছে?