হেপাটাইটিস বি: লক্ষণ, ছড়ানোর পথ, টিকা ও লিভারের সুরক্ষা
বাংলাদেশে গুরুতর লিভার রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হেপাটাইটিস বি, অথচ বহু মানুষ বছরের পর বছর এই ভাইরাস বহন করেও তা জানেন না। প্রথম দিকে সাধারণত কোনো উপসর্গ না থাকায় ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ ভাবলেও ভেতরে ভেতরে লিভারের ক্ষতি হতে থাকে। আশার কথা হলো, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী একটি টিকা হেপাটাইটিস বি প্রায় পুরোপুরি প্রতিরোধ করতে পারে, আর একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষাই আজ আপনার অবস্থা জানিয়ে দিতে পারে। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের একটি বড় অংশের কারণ হেপাটাইটিস বি, যার প্রায় পুরোটাই প্রতিরোধযোগ্য।
হেপাটাইটিস বি কী এবং নীরব বাহক কাকে বলে?
হেপাটাইটিস বি একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ যা লিভারকে আক্রমণ করে। অনেকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একে সারিয়ে ফেলে, কিন্তু কারও কারও শরীরে ভাইরাসটি সারাজীবন থেকে যায়—এদের বলা হয় ক্রনিক বাহক। একজন নীরব বাহক বছরের পর বছর সম্পূর্ণ সুস্থ বোধ করতে পারেন, কোনো উপসর্গও থাকে না, তবু তিনি অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেন এবং কয়েক দশকে ধীরে ধীরে লিভারের ক্ষতি, সিরোসিস এমনকি লিভার ক্যান্সারও হতে পারে। এ কারণেই সুস্থ থাকলেও পরীক্ষা জরুরি।
হেপাটাইটিস বি কীভাবে ছড়ায়?
হেপাটাইটিস বি ছড়ায় সংক্রমিত রক্ত ও দেহরসের মাধ্যমে, একসঙ্গে খাবার ভাগ করে খেলে নয়। বাংলাদেশে ছড়ানোর সাধারণ পথগুলোর মধ্যে আছে অনিরাপদ সুঁই-সিরিঞ্জ, সেলুনে জীবাণুমুক্ত না করা ক্ষুর-ব্লেড, পরীক্ষা ছাড়া রক্ত নেওয়া, এবং সংক্রমিত মায়ের কাছ থেকে জন্মের সময় শিশুর শরীরে যাওয়া। অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। জড়িয়ে ধরা, একসঙ্গে খাওয়া বা একই প্লেট ব্যবহারে এটি ছড়ায় না।
উপসর্গ কী এবং কোন পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়?
অনেকের কোনো উপসর্গই থাকে না। উপসর্গ দেখা দিলে চোখ ও ত্বক হলুদ হওয়া (জন্ডিস), গাঢ় রঙের প্রস্রাব, প্রচণ্ড ক্লান্তি, বমিভাব, অরুচি এবং পেটের ওপরের ডান দিকে ব্যথা হতে পারে। HBsAg নামের একটি সহজ ও সস্তা রক্ত পরীক্ষা দেখিয়ে দেয় এই মুহূর্তে আপনি ভাইরাস বহন করছেন কিনা। অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে—বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মী, সেলুনে যাতায়াতকারী ও রোগীর পরিবারের সদস্যদের—ডাক্তারের কাছে এই পরীক্ষাটি চাওয়া উচিত।
হেপাটাইটিস বি টিকা কাদের নেওয়া উচিত?
হেপাটাইটিস বি টিকা নিরাপদ ও অত্যন্ত কার্যকর, সাধারণত ছয় মাসে তিনটি ডোজে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে এটি শিশুদের নিয়মিত টিকা তালিকার অংশ, তবে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক এখনও টিকা নেননি। বাহকের পরিবারের সবার পরীক্ষা করানো উচিত এবং আগে থেকে সংক্রমিত না হলে টিকা নেওয়া উচিত। স্বাস্থ্যকর্মী, ডায়ালাইসিস রোগী এবং বেশি ঝুঁকিতে থাকা যে কারোরই সুরক্ষা নেওয়া দরকার। আগে একবার সংক্রমিত হয়ে সেরে উঠে থাকলে হয়তো টিকা না-ও লাগতে পারে, তাই একটি দ্রুত পরীক্ষা সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
ক্রনিক হেপাটাইটিস বি নিয়ে জীবনযাপন
আপনি ক্রনিক বাহক হলে আতঙ্কিত হবেন না, তবে নিয়মিত একজন লিভার বিশেষজ্ঞ দেখান। ক্রনিক হেপাটাইটিস বি-তে রক্ত পরীক্ষা ও আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে পর্যবেক্ষণ দরকার, আর কিছু রোগীর ডাক্তারের পরামর্শে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ লাগে। মদ্যপান এড়িয়ে চলুন এবং কখনও ভেষজ "লিভার টনিক" বা অপ্রমাণিত চিকিৎসার ওপর নির্ভর করবেন না, এতে উপকারের বদলে ক্ষতি বেশি হতে পারে—একই সতর্কতা অন্য লিভার সমস্যার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যা ব্যাখ্যা করা আছে আমাদের ফ্যাটি লিভার প্রাকৃতিকভাবে কমানো লেখাটিতে। গর্ভবতী নারীদের অবশ্যই পরীক্ষা করানো উচিত, কারণ জন্মের সময় সময়মতো ব্যবস্থা নিলে শিশুকে রক্ষা করা যায়।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
কখনও পরীক্ষা না করালে, গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে, কিংবা পরিচিত কোনো বাহকের সঙ্গে বসবাস করলে HBsAg পরীক্ষার জন্য ডাক্তার দেখান। চোখ বা ত্বক হলুদ হওয়া, গাঢ় প্রস্রাব, বারবার বমি, পেট ফুলে যাওয়া, কিংবা বিভ্রান্তি ও ঝিমুনি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন—এগুলো লিভারের গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। আমাদের নিবন্ধিত ডাক্তারের তালিকা থেকে লিভার বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক খুঁজে নিতে পারেন, আর হেপাটাইটিস বি-র যেকোনো ওষুধ কেবল চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানেই নেওয়া উচিত।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।