See in English
Illustration of heat stroke danger under blazing summer sun in Bangladesh

হিট স্ট্রোক ও গরমে অসুস্থতা: বাংলাদেশের গ্রীষ্মে নিরাপদ থাকার নিয়ম

প্রতি বছর এপ্রিল-মে মাসে বাংলাদেশে নামে তীব্র তাপপ্রবাহ — ঢাকার কংক্রিট থেকে খোলা মাঠ, সবখানেই অনুভূত তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়। পত্রিকায় আসে রিকশাচালক, কৃষক, ট্রাফিক পুলিশের মৃত্যুর খবর — যার বেশিরভাগই ছিল প্রতিরোধযোগ্য। সাধারণ গরমজনিত ক্লান্তি (heat exhaustion) আর প্রকৃত হিট স্ট্রোকের পার্থক্য জানা থাকলে, আর দ্রুত ব্যবস্থা নিলে, নিজের পরিবারেই একটি প্রাণ বাঁচাতে পারেন।

হিট এক্সহশন আর হিট স্ট্রোকের পার্থক্য কী?

হিট এক্সহশন শরীরের সতর্ক-সংকেত: প্রচুর ঘাম, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, বমিভাব, পেশিতে টান আর ঠান্ডা-ভেজা ত্বক — ছায়া, বিশ্রাম ও পানীয়তে সাধারণত সেরে যায়। হিট স্ট্রোক একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি: শরীরের ঠান্ডা হওয়ার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রির ওপরে উঠে যায়, ত্বক প্রায়ই গরম ও শুকনো হয়ে যায়, রোগী এলোমেলো কথা বলে, অদ্ভুত আচরণ করে বা অজ্ঞান হয়ে পড়ে। চিকিৎসা না হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মস্তিষ্ক, কিডনি ও হার্টের ক্ষতি হয়, মৃত্যুও হতে পারে — তাই সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়া দরকার।

বাংলাদেশে কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?

যাঁরা রোদে কাজ করেন — রিকশাচালক, কৃষক, নির্মাণ ও পোশাক শ্রমিক, হকার, ট্রাফিক পুলিশ — তাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং ডায়াবেটিস, হার্ট, কিডনি বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা ঘরের ভেতরেও গরম কম সহ্য করতে পারেন। টিনের চালা বা বাতাস চলাচলহীন ঘরে লোডশেডিংয়ের সময় ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে, আর পার্ক করা গাড়ির ভেতরের তাপ কয়েক মিনিটেই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

প্রতিরোধ: গরমের মাসগুলোর সহজ নিয়ম

  • তৃষ্ণার অপেক্ষায় না থেকে নিয়ম করে পানি খান — গরমে মোটামুটি প্রতি ঘণ্টায় এক গ্লাস; খুব তৃষ্ণা পাওয়া মানে আপনি আগেই পিছিয়ে পড়েছেন।
  • প্রস্রাবের রং দেখুন: হালকা হলুদ মানে পানি ঠিক আছে; গাঢ় হলুদ মানে আরও খেতে হবে। খুব ঘামের দিনে ওরস্যালাইন বা সামান্য লবণ দেওয়া পানি-লেবুর শরবত কাজে দেয় — তবে কিডনি, হার্ট বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন (পড়ুন আমাদের কিডনি সুরক্ষার গাইড)।
  • কাজের সময় বদলান: ভারী বাইরের কাজ সকাল ১১টার আগে বা বিকেল ৪টার পরে করুন; মাঝের সময়ে প্রতি ঘণ্টায় ছায়ায় বিরতি নিন।
  • গরমের পোশাক: ঢিলেঢালা, হালকা রঙের সুতির কাপড়; বাইরে গেলে টুপি বা ছাতা।
  • পার্ক করা গাড়িতে শিশুকে — বা কাউকেই — রেখে যাবেন না, জানালা একটু খোলা রেখে 'দুই মিনিটের জন্য' হলেও না।
  • ভর গরমে কড়া চা-কফি কমান, মদ এড়িয়ে চলুন; হালকা খাবার আর পানিভরা ফল — তরমুজ, শসা, ডাবের পানি — বেশি খান।

হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক চিকিৎসা: প্রতিটি মিনিট মূল্যবান

গরমে কেউ খুব তেতে গেলে, এলোমেলো আচরণ করলে বা ঢলে পড়লে হিট স্ট্রোক ধরে নিয়েই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিন:

  1. রোগীকে ছায়ায় বা ঠান্ডা ঘরে নিন; সাহায্য ডাকুন এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
  2. বাড়তি কাপড় খুলে শরীর দ্রুত ঠান্ডা করুন: গায়ে পানি ঢালুন বা ভেজা কাপড়ে মুছে দিন, ঘাড়-বগল-কুঁচকিতে ভেজা কাপড় রাখুন, আর একটানা বাতাস করুন।
  3. রোগী পুরোপুরি সজাগ থাকলে অল্প অল্প করে পানি বা ওরস্যালাইন দিন। এলোমেলো আচরণ করছে, বমি করছে বা অজ্ঞান — এমন কারও মুখে কিছুই দেবেন না; শ্বাসনালিতে আটকে যেতে পারে।
  4. প্যারাসিটামল বা অ্যাসপিরিনের ভরসায় থাকবেন না — জ্বরের ওষুধে হিট স্ট্রোকের তাপমাত্রা নামে না, বরং ক্ষতি হতে পারে।
  5. হাসপাতালে নেওয়ার পথেও শরীর ঠান্ডা করা চালিয়ে যান — আগে ঠান্ডা করা, সঙ্গে দ্রুত হাসপাতাল।

আপনার নিয়মিত ওষুধই কি গরম সহ্যের ক্ষমতা কমাচ্ছে?

হ্যাঁ, হতে পারে — বেশ কিছু পরিচিত ওষুধ ঘাম কমিয়ে দেয়, শরীর থেকে পানি বের করে দেয় বা তৃষ্ণার অনুভূতি ভোঁতা করে, ফলে গরমে অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে। যেমন: কোনো কোনো রক্তচাপের ট্যাবলেট ও ডাইউরেটিক ('পানির ট্যাবলেট'), কিছু অ্যালার্জির (antihistamine), মানসিক রোগের ও পারকিনসনের ওষুধ। নিজে থেকে কোনো প্রেসক্রাইব করা ওষুধ বন্ধ করবেন না; বরং গরমে পানি ও কাজকর্ম কীভাবে সামলাবেন তা ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন, আর কী কী ওষুধ খাচ্ছেন তা নির্ভরযোগ্য ওষুধের ডিরেক্টরিতে মিলিয়ে রাখুন। উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা পড়ুন আমাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের গাইডটিও।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

গরমে কারও শরীর খুব গরম ও ত্বক তেতে আছে, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, এলোমেলো আচরণ, খিঁচুনি বা অজ্ঞান — সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিন; 'দেখি কমে কি না' বলে অপেক্ষা করবেন না। এছাড়া নিচের যেকোনোটি ঘটলে সেদিনই ডাক্তার দেখান:

  • ছায়া, বিশ্রাম ও পানীয়র পরও ৩০-৬০ মিনিটে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমি বা পেশির টান না কমলে
  • প্রস্রাব খুব গাঢ় বা কম হয়ে গেলে, কিংবা বন্ধ হয়ে গেলে — পানিশূন্যতায় কিডনির ক্ষতির লক্ষণ
  • শিশু, বয়স্ক বা গর্ভবতী কারও অস্বাভাবিক ঝিমুনি, শুকনো মুখ বা চোখ বসে যাওয়া দেখা দিলে
  • গরমে বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট শুরু হলে

গরমজনিত অসুস্থতার পরে ফলো-আপ বা ক্রনিক রোগীদের গ্রীষ্মকালীন পরামর্শের জন্য ChamberBD-তে আপনার কাছের রেজিস্টার্ড ডাক্তার খুঁজুন।

এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

এই তথ্যটি কি আপনার কাজে লেগেছে?