হার্ট অ্যাটাকের ৭টি সতর্ক সংকেত — কখনো অবহেলা করবেন না
আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক কম বয়সেই বাংলাদেশের মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছেন, আর অনেক প্রাণ হারিয়ে যাচ্ছে শুধু এই কারণে যে প্রথম দিকের সতর্ক সংকেতগুলোকে "গ্যাস" বা সাধারণ ক্লান্তি ভেবে অবহেলা করা হয়। হৃদরোগ এখন দেশের অন্যতম প্রধান মৃত্যুর কারণ, তাই হার্ট অ্যাটাক আসলে কেমন অনুভূত হয় তা জানাটা জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। প্রথম এক ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাই লক্ষণ চিনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রতিটি পরিবারের জানা উচিত।
হার্ট অ্যাটাকের ৭টি সতর্ক সংকেত কী কী?
হার্ট অ্যাটাক সবসময় সিনেমার মতো বুক চেপে ধরা নাটকীয় দৃশ্যের মতো হয় না। সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলো হলো বুকে চাপ, ব্যথা বাঁ হাত বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া এবং হঠাৎ শ্বাসকষ্ট। এর সঙ্গে ঠান্ডা ঘাম, বমিভাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও মাথা ঘোরাও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
- বুকে চাপ বা ভারী অনুভূতি: বুকের মাঝখানে চাপ দেওয়া, আঁটসাঁট বা জ্বালাপোড়া অনুভূতি যা কয়েক মিনিটের বেশি থাকে।
- বাঁ হাত বা চোয়ালে ব্যথা: ব্যথা হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া।
- শ্বাসকষ্ট: বুকে ব্যথা থাকুক বা না থাকুক, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
- ঠান্ডা ঘাম: কোনো পরিশ্রম ছাড়াই শরীর ঠান্ডা ঘামে ভিজে যাওয়া।
- বমিভাব বা বমি: অনেক সময় একে বদহজম বা গ্যাসের সমস্যা ভেবে ভুল করা হয়।
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি: হঠাৎ অতিরিক্ত দুর্বলতা, যা কয়েক দিন আগে থেকেও দেখা দিতে পারে।
- মাথা ঘোরা: মাথা হালকা লাগা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অনুভূতি, কখনো বুক ধড়ফড়ের সঙ্গে।
নারীদের হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কি আলাদা?
হ্যাঁ, নারীদের ক্ষেত্রে প্রায়ই "অস্বাভাবিক" ধরনের লক্ষণ দেখা যায় যা সহজে চোখ এড়িয়ে যায়। তীব্র বুকব্যথার বদলে অনেক নারীর শ্বাসকষ্ট, বমিভাব, চোয়াল বা পিঠের উপরের অংশে ব্যথা, প্রচণ্ড ক্লান্তি বা বদহজমের মতো অস্বস্তি হয়। লক্ষণগুলো মৃদু মনে হওয়ায় বাংলাদেশের নারীরা প্রায়ই হাসপাতালে যেতে দেরি করেন, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। কোমরের উপরের অংশে কোনো ব্যাখ্যাহীন, দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি হলে দ্রুত গুরুত্ব দিন।
সঙ্গে সঙ্গে কী করবেন?
হার্ট অ্যাটাকের যেকোনো সন্দেহকে জরুরি অবস্থা হিসেবে নিন। সব কাজ বন্ধ করে বসে বা শুয়ে পড়ুন এবং যত দ্রুত সম্ভব কাছের হৃদরোগ চিকিৎসার সুবিধাযুক্ত হাসপাতালে পৌঁছান। বাড়িতে "দেখি কী হয়" ভেবে অপেক্ষা করবেন না।
- সঙ্গে সঙ্গে কাউকে দিয়ে হাসপাতালে যান। নিজে গাড়ি চালাবেন না, কারণ পথে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন।
- অ্যাসপিরিন শুধু তখনই চিবিয়ে খাবেন যদি ডাক্তার বা জরুরি সেবা পরামর্শ দেয় এবং আপনার অ্যালার্জি না থাকে; এর বাইরে নিজে থেকে কোনো ওষুধ খাবেন না।
- আঁটসাঁট পোশাক ঢিলা করুন এবং যানবাহনের ব্যবস্থা করার সময় যতটা সম্ভব শান্ত থাকুন।
- রোগী সাড়া না দিলে ও স্বাভাবিক শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে, প্রশিক্ষণ থাকলে সিপিআর (CPR) শুরু করুন।
বাংলাদেশে হার্ট অ্যাটাক কেন বাড়ছে?
প্রতিদিনের কিছু অভ্যাসই এই বৃদ্ধির পেছনে দায়ী। ব্যাপক তামাক সেবন, লবণ ও তেলে ভাজা খাবার, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ কোলেস্টেরল ধীরে ধীরে রক্তনালির ক্ষতি করে। ব্যস্ত শহুরে জীবনে শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, মানসিক চাপ ও স্থূলতা এই ঝুঁকি আরও বাড়ায়। অনেকেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান না, ফলে এসব ঝুঁকি হার্ট অ্যাটাক না হওয়া পর্যন্ত লুকিয়ে থাকে। পরিবারে কম বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি আরও বেশি।
হৃদয় ভালো রাখবেন কীভাবে?
বেশিরভাগ হার্ট অ্যাটাকই প্রতিদিনের কিছু সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ, যা নিয়ে বিস্তারিত আছে আমাদের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ১০টি উপায় লেখায়।
- বেশি করে শাকসবজি, মাছ ও আঁশযুক্ত খাবার খান; ভাজাপোড়া, বাড়তি লবণ ও মিষ্টি পানীয় কমান।
- সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন অন্তত ৩০ মিনিট জোরে হাঁটুন।
- ধূমপান এবং জর্দা ও গুলসহ সব ধরনের তামাক ছাড়ুন।
- নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও ওজন স্বাভাবিক রাখুন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
কয়েক মিনিটের বেশি বুকে চাপ, হাত বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে সঙ্গে সঙ্গে জরুরি বিভাগে যান। লক্ষণ আপনাআপনি চলে যাওয়ার অপেক্ষা করবেন না এবং ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর করবেন না। নিশ্চিত না হলেও পরীক্ষা করিয়ে নেওয়াই নিরাপদ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা পারিবারিক হৃদরোগের ইতিহাসের মতো দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি সামলাতে ChamberBD-তে একজন যাচাই করা ডাক্তারের সঙ্গে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং নিয়মিত হৃদয়ের খেয়াল রাখুন।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।