কানের সংক্রমণ: শিশু ও বড়দের ব্যথা ও যত্ন
কানে ব্যথা খুব সাধারণ ও কষ্টদায়ক সমস্যা, বিশেষত ছোট শিশুদের, যারা হয়তো শুধু কাঁদে, কান টানে আর ঠিকমতো ঘুমায় না। বাংলাদেশে বেশিরভাগ কানের সংক্রমণ সর্দির পর হয় কিংবা কানে পানি ঢোকা ও খোঁচানো থেকে আসে, আর অনেকটাই সহজ যত্নে ভালো হয়ে যায়। তবে পুঁজ ঝরা বা বারবার সংক্রমিত কান কখনো অবহেলা করা উচিত নয়, কারণ কান সংবেদনশীল এবং শিশুর শেখার জন্য শ্রবণশক্তি গুরুত্বপূর্ণ। এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য; এটি যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শের বিকল্প নয়।
কানের সংক্রমণ কী?
সাধারণত দুই ধরনের হয়। মধ্যকর্ণের সংক্রমণ কানের পর্দার পেছনে হয় এবং প্রায়ই সর্দির পর আসে, যখন ওই ফাঁকা জায়গায় তরল ও জীবাণু জমে ব্যথা হয় এবং কখনো পর্দা ফেটে পুঁজ ঝরে। বহিঃকর্ণের সংক্রমণ হয় কানের নালিতে, প্রায়ই সাঁতার, গোসল বা কান চুলকানোর পর, যা নালিকে লাল, ফোলা ও ব্যথাযুক্ত করে। শিশুদের মধ্যকর্ণের সংক্রমণ সহজে হয়, কারণ কান নিষ্কাশনের ছোট নলটি খাটো এবং সহজে বন্ধ হয়ে যায়।
লক্ষণগুলো কী কী?
- কানে ব্যথা—তীক্ষ্ণ, দপদপে বা শুয়ে পড়লে বেশি হতে পারে।
- শিশু ও ছোটদের: কান্না, কান টানা বা ঘষা, জ্বর, ঠিকমতো না খাওয়া ও ঘুমের ব্যাঘাত।
- শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া বা কান বন্ধ, ভারী লাগার অনুভূতি।
- কান থেকে তরল বা পুঁজ ঝরা, কখনো কখনো এতে ব্যথা কমে যায়।
- বহিঃকর্ণের সংক্রমণে: কানে স্পর্শ বা টান লাগলে ব্যথা এবং নালিতে চুলকানি।
কানের সংক্রমণের কারণ ও ট্রিগার কী?
মধ্যকর্ণের সংক্রমণ সাধারণত সর্দি, ফ্লু বা নাকের অ্যালার্জি দিয়ে শুরু হয়, যা নিষ্কাশন নল বন্ধ করে দেয়। ঘন ঘন সর্দি, সিগারেট ও রান্নার ধোঁয়া এবং শুইয়ে রেখে ফিডার খাওয়ানো শিশুদের ঝুঁকি বাড়ায়। বহিঃকর্ণের সংক্রমণ প্রায়ই হয় সাঁতার বা গোসলের পর নালিতে পানি জমে থাকা থেকে, এবং কটন বাড, কানের খোঁচা, চাবি বা দেশলাই কাঠি দিয়ে কান চুলকানো বা পরিষ্কার করা থেকে, যা সংবেদনশীল চামড়ার ক্ষতি করে ও খইল ভেতরে ঠেলে দেয়।
ঘরে কীভাবে যত্ন নেবেন?
অনেক হালকা কানের সংক্রমণ সহায়ক যত্নে সারতে সারতে ভালো হয়ে যায়।
- ব্যথা ও জ্বরে প্যারাসিটামলের মতো সাধারণ ব্যথানাশক দিন; এটি আমাদের মেডিসিন ডিরেক্টরিতে দেখে নিতে পারেন।
- আরামের জন্য কানের ওপর গরম (গরম নয় বেশি, কুসুম গরম) সেঁক দিন।
- কান শুকনো রাখুন; গোসল বা সাঁতারের সময় ভেতরে পানি ঢোকা এড়ান।
- ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কানে তেল, রসুন, বুকের দুধ বা কোনো ড্রপ দেবেন না, বিশেষত পুঁজ ঝরলে।
- নাক বন্ধ ও অ্যালার্জির চিকিৎসা করুন, কারণ এতে মধ্যকর্ণ নিষ্কাশনে সুবিধা হয়।
কান খোঁচানো কেন বিপজ্জনক?
যত ইচ্ছাই হোক, কটন বাড, কানের খোঁচা, আঙুল বা ধারালো জিনিস দিয়ে কানের ভেতরে কখনো খোঁচানো উচিত নয়। কানের নালি নিজেই পরিষ্কার হয়, আর খোঁচালে খইল ভেতরে চলে যায়, চামড়া ছিঁড়ে যায় এবং কানের পর্দা ফেটে সংক্রমণ, রক্তপাত এমনকি শ্রবণশক্তি কমে যেতে পারে। পুঁজ ঝরা কান শুধু বাইরে থেকে পরিষ্কার ও শুকনো রেখে ডাক্তার দেখানো উচিত, ঘরে খুঁচিয়ে পরিষ্কার নয়। প্রেসক্রিপশন পেলে নির্দেশনা পরিষ্কার রাখতে আমাদের ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল সাহায্য করতে পারে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
কানে ব্যথা তীব্র হলে, এক-দুই দিনের বেশি থাকলে, প্রচণ্ড জ্বরসহ হলে, কিংবা কান থেকে পুঁজ ঝরলে ডাক্তার দেখান—বিশেষত ছয় মাসের কম বয়সী শিশু বা বারবার কানের সংক্রমণ হলে, যাতে শ্রবণশক্তি ও পর্দা যাচাই করা যায়। বিপদচিহ্নে দ্রুত চিকিৎসা নিন: কানের পেছনের হাড়ের ওপর ফোলা, লালভাব বা ব্যথা, তীব্র মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হওয়া, মুখ একদিকে বেঁকে যাওয়া, মাথা ঘোরা, কিংবা খুব ঝিমিয়ে থাকা অসুস্থ শিশু। এই বিরল লক্ষণগুলো সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। আপনি নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের মতো সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দেখুন এবং সর্দি ও শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে পড়ুন আরও স্বাস্থ্য টিপস।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
কটন বাড দিয়ে কান পরিষ্কার করা কি নিরাপদ?
না। কান নিজেই পরিষ্কার হয়, আর কটন বাড, খোঁচা বা অন্য জিনিস খইল ভেতরে ঠেলে দেয়, নালি ছড়ে যায় ও পর্দার ক্ষতি করতে পারে। শুধু বাইরের কান কাপড় দিয়ে মুছুন, আর খইল জমে বন্ধ বা ব্যথা হলে ঘরে খুঁচিয়ে না বের করে ডাক্তার দেখান।
আমার শিশুর কান থেকে পুঁজ ঝরছে—কী করব?
পুঁজ ঝরা প্রায়ই বোঝায় যে সংক্রমণে কানের পর্দায় ছোট ছিদ্র হয়েছে। বাইরের কান পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন, ভেতরে কিছু দেবেন না এবং দ্রুত ডাক্তার দেখান, কারণ সঠিক চিকিৎসা সারতে সাহায্য করে ও শ্রবণশক্তি রক্ষা করে। যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কানে পানি ঢোকা এড়িয়ে চলুন।
সব কানের সংক্রমণে কি অ্যান্টিবায়োটিক লাগে?
না। অনেক হালকা মধ্যকর্ণের সংক্রমণ, বিশেষত বড় শিশুদের, কয়েক দিনে ব্যথানাশকেই নিজে থেকে ভালো হয়ে যায়। বয়স, তীব্রতা ও পুঁজ আছে কিনা দেখে ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক লাগবে কিনা ঠিক করেন, তাই নিজে থেকে কিনে শুরু করা উচিত নয়।
সাঁতার বা গোসল কি কানের সংক্রমণ ঘটাতে পারে?
হ্যাঁ, কানের নালিতে পানি জমে থাকলে বহিঃকর্ণের সংক্রমণ হতে পারে, যাকে কখনো সুইমার্স ইয়ার বলা হয়। গোসল বা সাঁতারের পর বাইরের কান আলতো করে শুকিয়ে নেওয়া এবং নালি না খোঁচানো—দুটিই এটি প্রতিরোধে সাহায্য করে, বিশেষত যাদের ঘন ঘন হয়।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।