ChamberBD Logo ChamberBD
Illustration of HPV vaccine and cervical cancer screening awareness for women

জরায়ুমুখ ক্যান্সার: এইচপিভি টিকা, স্ক্রিনিং ও প্রতিরোধ

জরায়ুমুখ ক্যান্সার বাংলাদেশের নারীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ — প্রতি বছর হাজারো নারীর প্রাণ কেড়ে নেয় এই রোগ। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারগুলোর একটি এটিই: একটি নিরাপদ টিকা, পাঁচ মিনিটের একটি স্ক্রিনিং পরীক্ষা আর সময়মতো চিকিৎসা — এই তিনে মিলে রোগটিকে প্রাণঘাতী হওয়ার বহু আগেই থামিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু লজ্জা, তথ্যের অভাব আর 'আগে সংসার, পরে নিজে' অভ্যাসের কারণে বহু নারী এই সহজ সুরক্ষাগুলো থেকে বঞ্চিত থাকেন। প্রতিটি পরিবারের যা জানা দরকার, তা-ই থাকছে এই লেখায়।

জরায়ুমুখ ক্যান্সার কেন হয়?

প্রায় সব জরায়ুমুখ ক্যান্সারের কারণ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) — খুবই সাধারণ একটি ভাইরাস, যা ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শে ছড়ায়; জীবনের কোনো না কোনো সময়ে বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কই এর সংস্পর্শে আসেন। বেশিরভাগ নারীর শরীর নিজেই ভাইরাসটি দূর করে ফেলে, কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে উচ্চ-ঝুঁকির কিছু ধরন জরায়ুমুখে নীরবে থেকে যায় এবং ১০-১৫ বছর ধরে ধীরে ধীরে কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনে। এই দীর্ঘ, ধীর পরিবর্তনই টিকা ও স্ক্রিনিং এত কার্যকর হওয়ার কারণ — ক্যান্সার হওয়ার আগেই তা ঠেকানোর বা ধরার যথেষ্ট সময় থাকে।

এইচপিভি টিকা কাদের জন্য?

ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার আগেই দিলে এইচপিভি টিকা সবচেয়ে ভালো কাজ করে, তাই মোটামুটি ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের এই টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকার জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে এইচপিভি টিকা যুক্ত করেছে এবং ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে স্কুলবয়সী মেয়েদের বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে — বর্তমান সূচি জানতে স্কুল, সিভিল সার্জন অফিস বা স্থানীয় ইপিআই কেন্দ্রে খোঁজ নিন। বিশ্বজুড়ে কোটি মেয়েকে এই টিকা দেওয়া হয়েছে; এটি নিরাপদ ও কার্যকর।

গুজব শুনে অনেক অভিভাবক দ্বিধায় ভোগেন, তাই পরিষ্কার করে বলা যাক: এইচপিভি টিকা সন্তানধারণ ক্ষমতা বা ভবিষ্যৎ গর্ভধারণের কোনো ক্ষতি করে না, কোনো আচরণে উৎসাহও দেয় না। মেয়েকে এই টিকা দেওয়া মানে শৈশবের অন্য টিকার মতোই তাকে ভবিষ্যতের একটি ক্যান্সার থেকে রক্ষা করা। ক্যাম্পেইনের বয়স পেরিয়ে যাওয়া নারীরা ডাক্তারের সঙ্গে ক্যাচ-আপ টিকার বিষয়ে কথা বলতে পারেন।

স্ক্রিনিং: ভায়া (VIA) পরীক্ষা ও প্যাপ স্মিয়ার

টিকা সব ধরনের এইচপিভি ঠেকায় না, তাই প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের স্ক্রিনিং দরকারই। বাংলাদেশে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল ও অনেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরকারিভাবে বিনামূল্যে সহজ ভায়া পরীক্ষা (অ্যাসিটিক অ্যাসিড দিয়ে চোখে দেখে পরীক্ষা) করা হয়। ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী বিবাহিত বা যৌনজীবনে সক্রিয় নারীদের নিয়মিত স্ক্রিনিং করানোর পরামর্শ দেওয়া হয় — সাধারণত প্রায় প্রতি তিন বছরে একবার, বা ডাক্তার যেমন বলেন। বিকল্প হিসেবে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্যাপ স্মিয়ার করা যায়। পরীক্ষাটি লাগে মাত্র কয়েক মিনিট, প্রশিক্ষিত নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা গোপনীয়তা বজায় রেখে করেন, আর এতে ক্যান্সার-পূর্ব পরিবর্তন ধরা পড়ে — যার চিকিৎসা সহজ, অনেক সময় এক ভিজিটেই সম্ভব।

কোন লক্ষণগুলো কখনও অবহেলা করবেন না?

প্রাথমিক পর্যায়ের জরায়ুমুখ ক্যান্সারে অনেক সময় কোনো লক্ষণই থাকে না — সম্পূর্ণ সুস্থ বোধ করলেও স্ক্রিনিং জরুরি হওয়ার কারণ এটাই। লক্ষণ দেখা দিলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অস্বাভাবিক রক্তপাত — দুই মাসিকের মাঝে, সহবাসের পরে, কিংবা মেনোপজের পরে যেকোনো রক্তপাত — এবং লেগে থাকা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব। পরের দিকে তলপেট বা কোমরে ব্যথা ও সহবাসে ব্যথা দেখা দিতে পারে। এর কোনোটিই মানেই ক্যান্সার নয়, কিন্তু প্রতিটির জন্যই দেরি না করে ভালোভাবে পরীক্ষা দরকার।

স্বামী ও পরিবার কীভাবে পাশে দাঁড়াবেন?

আমাদের সমাজে একজন নারীর চিকিৎসা নিতে প্রায়ই পরিবারের উৎসাহ — কখনও বা অনুমতি — লাগে, তাই প্রতিরোধে পুরুষদের ভূমিকা অপরিহার্য। স্ক্রিনিংকে লজ্জার বিষয় নয়, রুটিন স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে দেখুন: স্ত্রীর বয়স ৩০ পেরোলে মনে করিয়ে দিন, অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করুন, সঙ্গে যান, আর মেয়ের এইচপিভি টিকায় সম্মতি দিন। শাশুড়ি ও পরিবারের বড় নারীরা ঘরে এই আলোচনাটা সহজ করে দিতে পারেন। কয়েক মিনিটের এই সহায়তা আক্ষরিক অর্থেই জীবন বাঁচাতে পারে — কারণ আগে ধরা পড়া, বিশেষত ক্যান্সার-পূর্ব অবস্থায় ধরা পড়া জরায়ুমুখ ক্যান্সার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরাময়যোগ্য।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

অস্বাভাবিক রক্তপাত বা স্রাব দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তার দেখান; লজ্জায় ভিজিট পেছাবেন না — ডাক্তাররা প্রতিদিনই এমন সমস্যা দেখেন, আর নারী গাইনি বিশেষজ্ঞ এখন প্রায় সর্বত্রই আছেন। আপনার বয়স ৩০-এর বেশি অথচ কখনও স্ক্রিনিং করাননি — সুস্থ বোধ করলেও একটি ভায়া বা প্যাপ পরীক্ষা করিয়ে নিন। চেম্বারবিডিতে আপনার কাছের গাইনি বিশেষজ্ঞ খুঁজে নিন; স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে নারী ডাক্তার বেছে নিতে পারেন।

  • দুই মাসিকের মাঝে, সহবাসের পরে, বা মেনোপজের পরে যেকোনো রক্তপাত
  • দুর্গন্ধযুক্ত বা রক্তমিশ্রিত স্রাব যা কমছে না
  • তলপেটে ব্যথা, কোমরে ব্যথা বা সহবাসের সময় ব্যথা
  • কারণ ছাড়াই আগের চেয়ে বেশি বা দীর্ঘ মাসিক
  • বয়স ৩০+ অথচ কখনও স্ক্রিনিং হয়নি — এখনই ভায়া বা প্যাপ পরীক্ষা করান

এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

এই তথ্যটি কি আপনার কাজে লেগেছে?