সাদা স্রাব (লিউকোরিয়া): স্বাভাবিক না সংক্রমণ ও যত্ন
সাদা যোনিস্রাব, যাকে প্রায়ই লিউকোরিয়া বলা হয়, প্রায় প্রতিটি নারীই খেয়াল করেন, অথচ এটি নিয়ে অনেক অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা ও লজ্জা তৈরি হয়। সত্যি হলো, কিছুটা স্রাব সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং এটি শরীরের যোনিকে পরিষ্কার ও সুস্থ রাখার উপায়। আসল বিষয় হলো স্বাভাবিক স্রাব আর সংক্রমণজনিত স্রাবের পার্থক্য চেনা—সংক্রমণে সাধারণত রং, গন্ধ বা পরিমাণ বদলে যায় এবং চুলকানি বা অস্বস্তি থাকে। পার্থক্য জানলে নারীরা একদিকে দুশ্চিন্তা থেকে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা কেনা থেকে রক্ষা পান। এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য; এটি যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শের বিকল্প নয়।
স্বাভাবিক যোনিস্রাব কী?
স্বাভাবিক স্রাব সাধারণত স্বচ্ছ বা দুধসাদা রঙের হয়, হালকা গন্ধ থাকে বা একেবারেই থাকে না এবং চুলকানি বা জ্বালা করে না। মাসিক চক্রজুড়ে এর পরিমাণ স্বাভাবিকভাবে বদলায়—চক্রের মাঝামাঝি, গর্ভাবস্থায় এবং যৌন উত্তেজনায় বেশি হয়। এই তরল মৃত কোষ বের করে দেয় এবং সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে, তাই পরিমিত স্রাব সুস্থ শরীরের লক্ষণ, সারানোর মতো কোনো সমস্যা নয়।
স্রাব কখন সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়?
আপনার চেনা ধরন থেকে পরিবর্তনই প্রধান সূত্র। লক্ষ্য করুন যদি দেখেন:
- ঘন, সাদা, ছানার মতো স্রাবের সঙ্গে তীব্র চুলকানি—প্রায়ই ইস্ট (ছত্রাক) সংক্রমণ।
- পাতলা, ধূসর-সাদা স্রাবের সঙ্গে আঁশটে গন্ধ, যা ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস হতে পারে।
- হলুদ বা সবুজাভ, ফেনাযুক্ত স্রাবের সঙ্গে চুলকানি বা জ্বালা—কখনো যৌনবাহিত সংক্রমণ।
- প্রস্রাবের সময় জ্বালা, মিলনে ব্যথা বা তলপেটে ব্যথাসহ স্রাব।
- মাসিকের মাঝে, মিলনের পর বা মেনোপজের পর রক্তমিশ্রিত যেকোনো স্রাব।
সংক্রমণ ও বেশি স্রাবের কারণ কী?
যোনিতে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য থাকে, আর সেই ভারসাম্য নষ্ট হলে প্রায়ই সংক্রমণ হয়। বাংলাদেশে সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে আছে গরম-আর্দ্র আবহাওয়ায় ভেজা অন্তর্বাস পরে থাকা, কড়া সাবান বা ভেতরে ধোয়া (ডুশিং) যা সুরক্ষাকারী ব্যাকটেরিয়া ধুয়ে ফেলে, অ্যান্টিবায়োটিক, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং কম বা অতিরিক্ত ধোয়া। কিছু সংক্রমণ সঙ্গীর মধ্যে ছড়ায়। গর্ভাবস্থা ও হরমোনের পরিবর্তনেও কোনো সংক্রমণ ছাড়াই স্বাভাবিক স্রাব বাড়তে পারে।
এই জায়গা কীভাবে সুস্থ রাখবেন?
ভালো, কোমল পরিচ্ছন্নতা বেশিরভাগ সমস্যা ঠেকায়, অথচ অতিরিক্ত ধোয়া বরং সমস্যা তৈরি করতে পারে।
- বাইরের অংশ শুধু পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিন; সুগন্ধি সাবান, অ্যান্টিসেপটিক ও যোনির ভেতরে ডুশিং এড়িয়ে চলুন।
- ঢিলেঢালা সুতির অন্তর্বাস পরুন, প্রতিদিন বদলান এবং বিশেষ করে আর্দ্র আবহাওয়ায় জায়গাটি শুকনো রাখুন।
- টয়লেট ব্যবহারের পর সবসময় সামনে থেকে পেছনে মুছুন, যাতে জীবাণু দূরে থাকে।
- মাসিকের সময় নিয়মিত প্যাড বদলান এবং বেশিক্ষণ একই প্যাড রেখে দেবেন না।
- ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখুন, কারণ এতে ইস্ট সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়ে।
ফার্মেসি থেকে যেমন-তেমন অ্যান্টিবায়োটিক বা ক্রিম দিয়ে নিজে চিকিৎসা করা এড়িয়ে চলুন, কারণ ভুল চিকিৎসা অবস্থা আরও খারাপ করতে পারে; ডাক্তার পরামর্শ দিলে নির্ধারিত ওষুধ সম্পর্কে আমাদের মেডিসিন ডিরেক্টরিতে পড়তে পারেন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
স্রাবের রং হলুদ, সবুজ বা ধূসর হয়ে গেলে, বাজে বা আঁশটে গন্ধ হলে, ঘন ছানার মতো হলে, কিংবা চুলকানি, জ্বালা বা ব্যথার সঙ্গে হলে ডাক্তার দেখান। এ ছাড়া মাসিকের মাঝে, মিলনের পর বা মেনোপজের পর যেকোনো রক্তপাত, তলপেটে ব্যথাসহ জ্বর, কিংবা গর্ভাবস্থায় স্রাব হলে যাচাই করানো দরকার। বারবার সংক্রমণ হলেও তা পরীক্ষা করানো উচিত। আপনি গাইনোকোলজিস্টের মতো সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দেখুন, চিকিৎসা পরিষ্কার রাখতে আমাদের ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল ব্যবহার করুন এবং নারীস্বাস্থ্য নিয়ে পড়ুন আরও স্বাস্থ্য টিপস। সঠিকভাবে শনাক্ত হলে বেশিরভাগ কারণই সহজে সারানো যায়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
সাদা স্রাব কি কিছু একটা সমস্যার লক্ষণ?
সাধারণত নয়। বাজে গন্ধ, চুলকানি বা ব্যথা ছাড়া স্বচ্ছ বা দুধসাদা স্রাব স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর, আর চক্রজুড়ে ও গর্ভাবস্থায় এর পরিমাণ স্বাভাবিকভাবে বদলায়। শুধু রং, গন্ধ বা পরিমাণ বদলালে কিংবা চুলকানি, জ্বালা বা ব্যথার সঙ্গে হলে তখনই মনোযোগ দরকার।
লিউকোরিয়া কি দুর্বলতা ঘটায় বা সন্তানধারণে ক্ষতি করে?
একটি প্রচলিত ধারণা হলো স্বাভাবিক স্রাবে শরীর নিঃশেষ হয় বা দুর্বলতা আসে, কিন্তু এটি একটি ভুল ধারণা; স্বাভাবিক স্রাবে আপনি দুর্বল হন না। তবে চিকিৎসাহীন সংক্রমণ কখনো ছড়িয়ে প্রজনন অঙ্গে প্রভাব ফেলতে পারে, এ কারণেই বিশেষভাবে সংক্রমণকে উপেক্ষা না করে চিকিৎসা করা উচিত।
পরিষ্কার থাকতে কি যোনি ধোয়ার তরল বা অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করব?
না। যোনির ভেতরে ধোয়া কিংবা সুগন্ধি সাবান ও অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার সুরক্ষাকারী ব্যাকটেরিয়া সরিয়ে দেয় এবং প্রায়ই সংক্রমণ কমানোর বদলে বাড়ায়। বাইরের অংশ পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে জায়গাটি শুকনো রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ।
চুলকানির জন্য কি ফার্মেসি থেকে ক্রিম বা ট্যাবলেট কিনে নিতে পারি?
না নেওয়াই ভালো। বিভিন্ন সংক্রমণে বিভিন্ন চিকিৎসা লাগে, আর ভুলটি ব্যবহার করলে সারতে দেরি হতে পারে কিংবা আরও গুরুতর সমস্যা ঢাকা পড়তে পারে। ডাক্তার কারণ শনাক্ত করে সঠিক ওষুধ দিতে পারেন, যা নিরাপদ এবং সাধারণত দ্রুত কাজ করে।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।