স্ক্যাবিস (খোসপাঁচড়া): রাতে চুলকানি, চিকিৎসা ও পরিবারের যত্ন
স্ক্যাবিস, বাংলায় যাকে খোসপাঁচড়া বলা হয়, একটি খুব সাধারণ ও তীব্র চুলকানিযুক্ত চর্মরোগ, যা ঘিঞ্জি বাসা, হোস্টেল ও মাদ্রাসায় সহজে ছড়ায়। এটি একধরনের ক্ষুদ্র মাইট দিয়ে হয়, যা ত্বকের নিচে গর্ত করে ঢুকে যায়, আর রাতের অবিরাম চুলকানিতে গোটা পরিবারের ঘুম নষ্ট হয়। ভালো খবর হলো, সঠিক ক্রিম ও কয়েকটি সহজ ঘরোয়া পদক্ষেপে স্ক্যাবিস পুরোপুরি সারে। আসল কথা, যা অনেকেই ভুলে যান—ঘরের সবাইকে একসঙ্গে চিকিৎসা নিতে হয়। এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য; এটি যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শের বিকল্প নয়।
স্ক্যাবিস কী এবং কীভাবে ছড়ায়?
স্ক্যাবিস হয় Sarcoptes scabiei নামের একটি অণুবীক্ষণিক মাইট দিয়ে। স্ত্রী মাইট ত্বকের ওপরের স্তরের নিচে গর্ত করে ডিম পাড়ে, আর মাইট ও তার বর্জ্যের প্রতি শরীরের প্রতিক্রিয়াতেই চুলকানি ও র্যাশ হয়। এটি মূলত দীর্ঘক্ষণ ত্বকে-ত্বকে স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়, এ কারণেই এক বিছানায় ঘুমানো বা গা ঘেঁষে বসা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এত সহজে ছড়িয়ে পড়ে। শেয়ার করা কাপড়, তোয়ালে ও বিছানার মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। স্ক্যাবিসের সঙ্গে অপরিচ্ছন্নতার সম্পর্ক নেই; পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘরেও এটি হতে পারে।
লক্ষণ ও বিপদচিহ্ন কী কী?
স্ক্যাবিসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এমন চুলকানি, যা রাতে এবং গরম পানিতে গোসলের পর অনেক বেড়ে যায়।
- তীব্র চুলকানি, বিশেষ করে রাতে, যা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়।
- ছোট ছোট লালচে দানা বা সরু আঁকাবাঁকা গর্তরেখাসহ ব্রণের মতো র্যাশ।
- আঙুলের ফাঁকে, কবজি, কনুই, কোমর, নিতম্ব ও যৌনাঙ্গে চুলকানি।
- শিশুদের ক্ষেত্রে হাতের তালু, পায়ের তলা, মাথার ত্বক ও মুখেও হতে পারে।
- চুলকানোর ফলে ঘা ও খোসা, যাতে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হতে পারে।
প্রায়ই ঘরের একাধিক মানুষ একসঙ্গে চুলকাতে থাকেন, যা স্ক্যাবিস হওয়ার জোরালো ইঙ্গিত।
বারবার ফিরে আসার কারণ কী?
স্ক্যাবিস ফিরে আসার সবচেয়ে সাধারণ কারণ অসম্পূর্ণ চিকিৎসা। সাধারণত যখন শুধু সবচেয়ে বেশি চুলকানি যার, তাকেই চিকিৎসা দেওয়া হয়, অথচ পরিবারের অন্যরা—যাদের হয়তো এখনো চুলকানি শুরু হয়নি—মাইট বহন করে আবার ছড়িয়ে দেন, তখনই পুনঃসংক্রমণ হয়। না ধোয়া বিছানা ও কাপড়ও আরেকটি উৎস। ক্রিম খুব তাড়াতাড়ি বন্ধ করা, বা শুধু চুলকানির জায়গায় লাগানো (পুরো শরীরে নয়) মাইটকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।
স্ক্যাবিসের চিকিৎসা কী?
সাধারণ চিকিৎসা হলো ডাক্তারের পরামর্শে ত্বকে পারমেথ্রিন ক্রিম লাগানো।
- গলা থেকে নিচ পর্যন্ত পুরো শরীরে ক্রিম লাগান—আঙুলের ফাঁক, নখের নিচে, নাভি, যৌনাঙ্গ ও পায়ের তলাসহ; শিশুদের ক্ষেত্রে মাথার ত্বক ও মুখেও দিতে হয়।
- ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সময় (সাধারণত সারারাত, প্রায় ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা) রেখে ধুয়ে ফেলুন।
- নতুন ফোটা মাইট মারতে সাধারণত এক সপ্তাহ পর দ্বিতীয়বার লাগাতে বলা হয়।
- উপসর্গ না থাকলেও পরিবারের সবাইকে ও ঘনিষ্ঠজনদের একই দিনে চিকিৎসা দিন।
- চুলকানি কমাতে ডাক্তার অ্যান্টিহিস্টামিন, আর ঘায়ে সংক্রমণ হলে অ্যান্টিবায়োটিক যোগ করতে পারেন।
দোকানির পরামর্শে যেমন-তেমন জিনিস না কিনে নির্ধারিত পারমেথ্রিনের মতো ক্রিম আমাদের মেডিসিন ডিরেক্টরিতে যাচাই করে নিতে পারেন। ক্রিম ও পরিবারের চিকিৎসা পরিকল্পনার পরিষ্কার লিখিত হিসাব রাখতে চাইলে আমাদের ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল সবকিছু গুছিয়ে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
ঘরে কীভাবে পুনঃসংক্রমণ ঠেকাবেন?
ত্বকের চিকিৎসা কাজের অর্ধেক মাত্র; একই সঙ্গে ঘরকেও মাইটমুক্ত করতে হবে।
- গত কয়েক দিনে ব্যবহৃত সব কাপড়, বিছানার চাদর, বালিশের কভার ও তোয়ালে গরম পানিতে ধুয়ে কড়া রোদে শুকান।
- যেগুলো ধোয়া যায় না, সেগুলো প্রায় এক সপ্তাহ প্লাস্টিকের ব্যাগে আটকে রাখুন, কারণ ত্বকের স্পর্শ ছাড়া মাইট মরে যায়।
- তোশক ও বালিশ রোদে শুকান, কারণ তাপ ও রোদ মাইট মেরে ফেলে।
- চুলকানোর ক্ষতি কমাতে নখ ছোট রাখুন।
- মনে রাখবেন, সফল চিকিৎসার পরও এক থেকে দুই সপ্তাহ চুলকানি থাকতে পারে, কারণ ত্বক তখনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে; এর মানে চিকিৎসা ব্যর্থ হয়েছে তা নয়।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
রোগ নিশ্চিত করতে ও সঠিক ক্রিম নিতে ডাক্তার দেখান, বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের জন্য, যাদের নির্দিষ্ট নিরাপদ ওষুধ লাগতে পারে। সঠিক চিকিৎসার দুই থেকে চার সপ্তাহ পরও চুলকানি ও র্যাশ না কমলে, ঘা লাল-ফোলা-গরম হলে বা পুঁজ গড়ালে (ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের লক্ষণ), অথবা ত্বক পুরু ও খোসাযুক্ত হয়ে গেলে—যা দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার মানুষে হতে পারে এবং অত্যন্ত ছোঁয়াচে—অবশ্যই চিকিৎসা নিন। জটিল বা বারবার হওয়া ক্ষেত্রে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ পথ দেখাতে পারেন; আমাদের তালিকা থেকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দেখুন এবং সাধারণ চর্মসমস্যা নিয়ে পড়ুন আরও স্বাস্থ্য টিপস।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
একজনের চুলকানি হলেও পুরো পরিবারকে কেন চিকিৎসা নিতে হবে?
কারণ চুলকানি শুরু হওয়ার অনেক আগেই স্ক্যাবিস ঘনিষ্ঠ স্পর্শে ছড়িয়ে পড়ে। যাদের কোনো অসুবিধা নেই, তারাও হয়তো মাইট বহন করছেন এবং চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিকে আবার সংক্রমিত করবেন। ঘরের সবাইকে একই দিনে চিকিৎসা দেওয়াই চক্র ভাঙার একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায়।
ক্রিম শেষ করেছি, তবু চুলকাচ্ছে। চিকিৎসা কি ব্যর্থ?
সবসময় নয়। সফল চিকিৎসার পরও এক থেকে দুই সপ্তাহ চুলকানি থাকতে পারে, কারণ ত্বক তখনো মরা মাইটের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। তবে এর পরও নতুন গর্ত বা নতুন দানা উঠতে থাকলে বা চুলকানি বাড়লে চিকিৎসা পুনর্বিবেচনার জন্য ডাক্তার দেখান।
কাপড় ও বিছানার মাধ্যমে কি স্ক্যাবিস ছড়ায়?
হ্যাঁ, তবে ত্বকে-ত্বকে স্পর্শের তুলনায় কম। মাইট শরীরের বাইরে অল্প সময় বাঁচতে পারে, তাই কাপড় ও বিছানা গরম পানিতে ধোয়া, রোদে শুকানো বা না ধোয়া জিনিস প্রায় এক সপ্তাহ ব্যাগে আটকে রাখা চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্ক্যাবিস কি অপরিচ্ছন্নতার লক্ষণ?
না। স্পর্শে ছড়ায় বলে যে কেউ যত পরিচ্ছন্নই হোন, স্ক্যাবিস হতে পারে। লজ্জার কিছু নেই; মনোযোগ থাকা উচিত শুধু সবাইকে চিকিৎসা দেওয়া ও বিছানা পরিষ্কারের দিকে।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।