ChamberBD Logo ChamberBD
See in English

দাদ (রিংওয়ার্ম): কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

দাদ (রিংওয়ার্ম) বাংলাদেশে গরম ও আর্দ্র মাসগুলোর অন্যতম সাধারণ চর্মসমস্যা। নাম যা-ই হোক, এর সঙ্গে কৃমির কোনো সম্পর্ক নেই; এটি একটি ছত্রাক সংক্রমণ, যা ত্বকে চুলকানিযুক্ত গোল চাকতির মতো দাগ তৈরি করে। ঘাম, আঁটসাঁট পোশাক ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া ছত্রাকের বেড়ে ওঠা ও ছড়ানোর জন্য আদর্শ পরিবেশ গড়ে দেয়। সঠিক অ্যান্টিফাঙ্গাল চিকিৎসায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেরে যায়, তবে একটি খুব সাধারণ ভুল—দোকান থেকে কেনা স্টেরয়েড ক্রিম ব্যবহার—দাদকে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে পারে। এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য; এটি যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শের বিকল্প নয়।

দাদ কী এবং বর্ষায় কেন বেশি হয়?

দাদ হয় ডার্মাটোফাইট নামের একদল ছত্রাক দিয়ে, যারা ত্বক, চুল ও নখের বাইরের স্তরের প্রোটিন কেরাটিন খেয়ে বাঁচে। এই ছত্রাক উষ্ণতা ও আর্দ্রতা পছন্দ করে, তাই বাংলাদেশের বর্ষা ও আর্দ্র গরমে সংক্রমণ অনেক বেশি হয়। ত্বকের ভাঁজে আটকে থাকা ঘাম, শেয়ার করা তোয়ালে ও কাপড়, আর ভেজা জুতা—সবই ছত্রাকের বাড়বাড়ন্তে সাহায্য করে। এটি শরীর, কুঁচকি, পা, মাথার ত্বক ও নখে হতে পারে।

লক্ষণ ও বিপদচিহ্ন কী কী?

দাদের সাধারণত একটি চেনা চেহারা থাকে, যা শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

  • লালচে বা কালচে, গোল চাকতির মতো দাগ, যার কিনারা উঁচু ও খসখসে।
  • মাঝখানের ত্বক তুলনামূলক পরিষ্কার, যা চিরচেনা আংটির আকার দেয়।
  • চুলকানি, যা ঘামলে প্রায়ই বাড়ে।
  • দাগ ধীরে ধীরে বাইরের দিকে বাড়ে এবং একাধিক দাগ মিলে যেতে পারে।
  • সাধারণ জায়গা: কুঁচকি, ঊরুর ভেতরের দিক, কোমর, বগল, পা ও পায়ের আঙুলের ফাঁক।

যখন চিরচেনা গোল আকার হারিয়ে গিয়ে র‍্যাশ একটি বড়, অস্পষ্ট সীমানার তীব্র চুলকানিযুক্ত জায়গায় পরিণত হয়, তখন প্রায়ই বুঝতে হয় স্টেরয়েড ক্রিম ব্যবহার করা হয়েছে এবং সংক্রমণের রূপ বদলে গেছে।

ছড়ানোর কারণ ও স্টেরয়েড ক্রিমের বিপদ

দাদ সহজে ছড়ায় সরাসরি ত্বকের স্পর্শে এবং শেয়ার করা তোয়ালে, কাপড়, চিরুনি ও বিছানার মাধ্যমে। আক্রান্ত পোষা ও গৃহপালিত পশু থেকেও ছড়াতে পারে। বাংলাদেশে দাদ একগুঁয়ে হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় কারণ স্টেরয়েডযুক্ত কম্বিনেশন ক্রিমের অপব্যবহার। এসব ক্রিম এক-দুই দিন চুলকানি কমায়, যা উন্নতি বলে মনে হয়, কিন্তু স্টেরয়েড ত্বকের প্রতিরক্ষা দুর্বল করে দেয় এবং ছত্রাককে আরও চওড়া ও গভীরে ছড়াতে দেয়। এতে চিকিৎসা অনেক কঠিন ও দীর্ঘ হয়ে যায়। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দাদে কখনোই স্টেরয়েড বা লেবেলবিহীন কম্বিনেশন ক্রিম ব্যবহার করবেন না।

দাদের চিকিৎসা কী?

চিকিৎসা হলো অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ, সঠিকভাবে ও যথেষ্ট সময় ধরে ব্যবহার করা।

  • সীমিত দাগে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম (যেমন ক্লোট্রিমাজল বা টারবিনাফিন) লাগান।
  • শুধু মাঝখানে নয়, দাগের দৃশ্যমান কিনারা ছাড়িয়ে একটু বাইরে পর্যন্ত ক্রিম লাগান।
  • পুনরায় হওয়া ঠেকাতে র‍্যাশ মিলিয়ে যাওয়ার পরও সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহ পুরো কোর্স চালিয়ে যান।
  • ব্যাপক, মাথার ত্বক বা নখের সংক্রমণে সাধারণত ডাক্তারের পরামর্শে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিফাঙ্গাল ট্যাবলেট লাগে।
  • পা ও কুঁচকি দুটোতেই হলে একসঙ্গে চিকিৎসা করুন, কারণ এরা প্রায়ই একে অপরকে আবার সংক্রমিত করে।

দোকানির বাছাইয়ের ওপর ভরসা না করে নির্ধারিত অ্যান্টিফাঙ্গাল আমাদের মেডিসিন ডিরেক্টরিতে যাচাই করতে পারেন, আর আপনার চিকিৎসা পরিকল্পনা গুছিয়ে রাখতে আমাদের ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল ব্যবহার করতে পারেন।

কীভাবে দাদ প্রতিরোধ করবেন?

ত্বক পরিষ্কার ও শুকনো রাখাই প্রতিরোধের মূল কথা।

  • গোসলের পর শরীর ভালো করে শুকান, বিশেষ করে ত্বকের ভাঁজ, কুঁচকি ও পায়ের আঙুলের ফাঁক।
  • ঢিলেঢালা, সুতি, বাতাস চলাচল করে এমন পোশাক পরুন এবং ঘামে ভেজা কাপড় দ্রুত বদলান।
  • তোয়ালে, কাপড়, চিরুনি বা জুতা শেয়ার করবেন না।
  • কাপড়, তোয়ালে ও বিছানার চাদর গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকান।
  • পা শুকনো রাখুন, পরিষ্কার মোজা ব্যবহার করুন এবং দীর্ঘক্ষণ ভেজা জুতা পরা এড়িয়ে চলুন।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

ক্রিম ব্যবহারের পরও র‍্যাশ ছড়াতে থাকলে, বড় জায়গা জুড়ে হলে, কিংবা মাথার ত্বক বা নখে হলে ডাক্তার দেখান, কারণ এতে সাধারণত ট্যাবলেট লাগে। আগেই স্টেরয়েড বা কম্বিনেশন ক্রিম ব্যবহার করে থাকলে, বারবার ফিরে এলে, অথবা ডায়াবেটিস বা দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলেও পরামর্শ নিন, কারণ তখন সংক্রমণ বেশি একগুঁয়ে হতে পারে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ রোগ নিশ্চিত করে সঠিক অ্যান্টিফাঙ্গাল বেছে দিতে পারেন; আমাদের তালিকা থেকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দেখুন এবং বর্ষার ত্বকের যত্ন নিয়ে পড়ুন আরও স্বাস্থ্য টিপস

সচরাচর জিজ্ঞাসা

ফার্মেসির ক্রিম ব্যবহারের পর আমার দাদ আরও খারাপ হয় কেন?

অনেক ওভার-দ্য-কাউন্টার ক্রিমে অ্যান্টিফাঙ্গালের সঙ্গে স্টেরয়েড মেশানো থাকে। স্টেরয়েড অল্প সময়ের জন্য চুলকানি কমায়, কিন্তু ত্বক দুর্বল করে ছত্রাককে আরও চওড়া ও গভীরে ছড়াতে দেয়। দাদ একগুঁয়ে হয়ে ওঠার এটিই সবচেয়ে সাধারণ কারণ। শুধু ডাক্তারের পরামর্শ দেওয়া সাধারণ অ্যান্টিফাঙ্গাল ব্যবহার করুন।

দাদ সারতে কত সময় লাগে?

ত্বকের সাধারণ দাগ সঠিক অ্যান্টিফাঙ্গাল ব্যবহারে প্রায়ই দুই থেকে চার সপ্তাহে ভালো হয়, তবে মিলিয়ে যাওয়ার পরও এক থেকে দুই সপ্তাহ ক্রিম চালিয়ে যাওয়া উচিত। মাথার ত্বক ও নখের সংক্রমণ অনেক বেশি সময় নেয় এবং সাধারণত কয়েক সপ্তাহ মুখে খাওয়ার ট্যাবলেট লাগে।

দাদ কি পরিবারে ছোঁয়াচে?

হ্যাঁ। এটি ত্বকের স্পর্শে এবং শেয়ার করা তোয়ালে, কাপড় ও বিছানার মাধ্যমে ছড়ায়। ব্যক্তিগত জিনিস শেয়ার করা এড়িয়ে চলুন, কাপড় ও তোয়ালে ধুয়ে রোদে শুকান এবং আক্রান্ত পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা দিন, যাতে সংক্রমণ ঘুরেফিরে না ছড়ায়।

পোষা প্রাণী থেকে কি দাদ হতে পারে?

হ্যাঁ। বিড়াল, কুকুর ও গৃহপালিত পশু দাদ বহন করে মানুষে ছড়াতে পারে। পোষা প্রাণীর গায়ে টাক বা খসখসে দাগ থাকলে পশুচিকিৎসককে দেখান এবং প্রাণী ধরার পর হাত ধুয়ে নিন।

এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

এই তথ্যটি কি আপনার কাজে লেগেছে?