তামাক ছাড়ুন: জর্দা, গুল ও মুখের ক্যান্সার
বাংলাদেশে অনেকেই মনে করেন, তামাক চিবিয়ে খাওয়া সিগারেট খাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ। দুঃখজনকভাবে এটি স্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল ধারণাগুলোর একটি। জর্দা, গুল, সাদাপাতা ও শাহি জর্দার মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী নানা রাসায়নিক থাকে, আর এগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা সরাসরি মুখের নরম কোষের সঙ্গে লেগে থাকে। ভালো খবর হলো, মুখের ক্যান্সার অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য, এবং যে কোনো বয়সে তামাক ছাড়লে ঝুঁকি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কমতে শুরু করে। বিপদটা বোঝাই সুস্থ মুখ ও দীর্ঘ জীবনের প্রথম ধাপ।
ধোঁয়াবিহীন তামাক কী এবং কেন এত ক্ষতিকর?
যে তামাক পোড়ানোর বদলে চিবিয়ে, চুষে বা মুখে রেখে খাওয়া হয়, তা-ই ধোঁয়াবিহীন তামাক। বাংলাদেশে এর সবচেয়ে পরিচিত রূপ হলো জর্দা (প্রায়ই পান-সুপারির সঙ্গে), গুল (দাঁতের মাড়িতে ঘষার গুঁড়ো) এবং সাদাপাতা বা কাঁচা তামাকপাতা। এগুলোর প্রতিটিতেই নিকোটিন থাকে, যা তীব্র আসক্তি তৈরি করে, পাশাপাশি দুই ডজনেরও বেশি ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক থাকে। এসব পণ্য মাড়ি ও গালের সঙ্গে লেগে থাকে বলে ওই জায়গাগুলো একটানা বিষাক্ত উপাদান শোষণ করে, আর তাই দীর্ঘদিনের ব্যবহারকারীদের মধ্যে মুখ ও গলার ক্যান্সার এত বেশি দেখা যায়।
মুখের ভেতরে আগাম বিপদচিহ্ন কী কী?
আগেভাগে ধরা পড়লে মুখের ক্যান্সারের চিকিৎসা অনেক সহজ হয়, তাই প্রতি মাসে আয়নায় নিজের মুখ পরীক্ষা করা ভালো। নিচের কোনো লক্ষণ দুই সপ্তাহের বেশি থাকলে ডাক্তার দেখান:
- মাড়ি, জিহ্বা, গাল বা মুখের তলায় সাদা বা লাল দাগ, যা ঘষলে উঠে আসে না।
- ঘা, আলসার বা গোটা যা সারছে না।
- মুখ খুলতে, চিবাতে বা গিলতে কষ্ট বা ব্যথা।
- গলায় কিছু আটকে আছে এমন অনুভূতি।
- অসাড়তা, একটানা রক্তপাত, কিংবা স্পষ্ট কারণ ছাড়াই দাঁত নড়া।
- মুখ কম খোলা বা শক্ত-জ্বালাপোড়া অনুভূতি (যাকে ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস বলে)।
কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
যত বেশি ও যত দীর্ঘদিন তামাক ব্যবহার করবেন, ঝুঁকি তত বাড়ে। যাঁরা জর্দার সঙ্গে সুপারি ও চুন মিশিয়ে খান, তাঁদের ঝুঁকি আরও বেশি, আর মদ্যপান যোগ হলে বিপদ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পুরুষেরা বেশি আক্রান্ত হলেও বাংলাদেশে গুল ও পানের মাধ্যমে নারীদের মধ্যেও এর ব্যবহার ব্যাপক। পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস এবং শাকসবজি-ফল কম খাওয়ার অভ্যাসও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তামাক স্থায়ীভাবে কীভাবে ছাড়বেন?
নিকোটিন সত্যিকার অর্থেই আসক্তিকর বলে ছাড়া কঠিন, তবে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ সফল হন। একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা সত্যিই পার্থক্য গড়ে দেয়।
- ছাড়ার একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করুন এবং পরিবারকে জানান, যেন তারা পাশে থাকে।
- ঘর ও পকেট থেকে সব জর্দা, গুল ও পান ফেলে দিন।
- খাওয়ার পর বা চায়ের সঙ্গে যে অভ্যাস জাগে, সেই ট্রিগার চিনুন এবং বদলে নিন পানি, চিনিমুক্ত চুইংগাম, লবঙ্গ বা ভাজা ছোলা দিয়ে।
- আকাঙ্ক্ষার সময় হাত ও মুখ ব্যস্ত রাখুন; সাধারণত কয়েক মিনিটেই তা কেটে যায়।
- আকাঙ্ক্ষা সামলানো কঠিন হলে নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বা অন্য সহায়তা নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
- একবার পিছলে গেলেও হাল ছাড়বেন না; সেখান থেকে শিখে আবার এগিয়ে যান।
তামাক ছাড়ার পর শরীরে কী ঘটে?
শরীর অবাক করার মতো দ্রুত সারতে শুরু করে। কয়েক দিনের মধ্যেই স্বাদ ও গন্ধ ফেরে এবং মুখ পরিষ্কার লাগে। কয়েক সপ্তাহ-মাসে মাড়ির জ্বালা কমে আসে এবং সাদা দাগ ফিকে হতে পারে। কয়েক বছরে মুখ, গলা ও অন্যান্য ক্যান্সারের ঝুঁকি ধীরে ধীরে অ-ব্যবহারকারীর কাছাকাছি নেমে আসে। তামাক ছাড়লে হৃৎপিণ্ডও সুরক্ষিত থাকে, রক্তচাপ কমে এবং পরিবারের অনেক টাকাও বাঁচে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
মুখের কোনো ঘা, দাগ, গোটা বা অসাড় জায়গা দুই সপ্তাহের বেশি থাকলে, মুখ পুরোপুরি খুলতে না পারলে, কিংবা চিবানো ও গিলতে ব্যথা হলে দেরি না করে ডাক্তার বা ডেন্টিস্ট দেখান। আগেভাগে পরীক্ষা ও সাধারণ বায়োপসিতে ক্যান্সার এমন পর্যায়ে ধরা পড়তে পারে, যখন তা ভালোভাবে চিকিৎসাযোগ্য। ওরাল সার্জন, ডেন্টিস্ট বা ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ খুঁজে নিতে পারেন আমাদের প্রাসঙ্গিক বিশেষজ্ঞ তালিকা থেকে। তামাক ছাড়ার সময় ডাক্তার কোনো সহায়ক ওষুধ দিলে কেনার আগে মেডিসিন ডিরেক্টরিতে যাচাই করে নিন। তামাকমুক্ত থাকার আরও পরামর্শের জন্য দেখুন আমাদের আরও স্বাস্থ্য টিপস।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
গুল কি সত্যিই সিগারেটের মতোই বিপজ্জনক?
হ্যাঁ। গুল নিরীহ কোনো দাঁতের গুঁড়ো নয়। এতে নিকোটিন ও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক থাকে, আর মাড়িতে ঘষলে মুখ সরাসরি ওই বিষের সংস্পর্শে আসে, যা মাড়ির রোগ ও মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
আগেভাগে ধরা পড়লে কি মুখের ক্যান্সার সারে?
প্রাথমিক পর্যায়ের মুখের ক্যান্সারে চিকিৎসায় প্রায়ই খুব ভালো ফল মেলে, আর দেরিতে ধরা পড়ার তুলনায় ফলাফল অনেক ভালো হয়। ঠিক এ কারণেই দুই সপ্তাহের বেশি থাকা যে কোনো ঘা বা দাগ ডাক্তারকে দেখানো উচিত।
অনেক বছর ধরে জর্দা খাচ্ছি, এখন ছাড়লে কি লাভ হবে?
কখনোই দেরি হয়নি। যেদিন থামবেন, সেদিন থেকেই ক্যান্সারের ঝুঁকি কমতে শুরু করে, আর যত বেশি দিন তামাকমুক্ত থাকবেন, ঝুঁকি তত কমে। তামাক ছাড়লে মাড়ি, স্বাদ, হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্য ও সার্বিক সুস্থতা সবই ভালো হয়।
তামাক ছাড়লে কি ওজন বাড়ে বা মানসিক চাপ হয়?
নিকোটিন ছাড়ার সঙ্গে শরীর মানিয়ে নেওয়ার সময় কেউ কেউ প্রথমে অস্থির বোধ করেন বা বেশি খান। পানি পান, সক্রিয় থাকা এবং হাতের কাছে স্বাস্থ্যকর খাবার রাখলে তা সামলানো যায়। এসব প্রভাব সাময়িক এবং তামাক চালিয়ে যাওয়ার ক্ষতির তুলনায় নিতান্তই সামান্য।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। নিজের অবস্থা সম্পর্কে যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।