হার্ট-সুস্থ জীবন: হৃদরোগ আগেই প্রতিরোধ
হৃদরোগ বাংলাদেশে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণে পরিণত হয়েছে, এবং আগের চেয়ে কম বয়সেই মানুষ এতে আক্রান্ত হচ্ছেন। আশ্বস্ত করার মতো সত্যটি হলো, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের বড় একটি অংশ বছর কয়েক আগে নেওয়া দৈনন্দিন কিছু সিদ্ধান্তেই প্রতিরোধ করা যায়। এর জন্য দামি যন্ত্র বা কঠোর ডায়েটের দরকার নেই। খাবার, চলাফেরা, ধূমপান ও মানসিক চাপ নিয়ে সহজ, ধারাবাহিক কিছু অভ্যাস হৃদয়কে শক্তিশালীভাবে রক্ষা করে, আর যত আগে শুরু করবেন তত বেশি উপকার।
বাংলাদেশে হৃদরোগ কেন বাড়ছে?
আধুনিক কিছু পরিবর্তন এই বৃদ্ধির পেছনে দায়ী: বেশি ভাজাপোড়া ও ফাস্ট ফুড, বেশি পরিমাণে সাদা ভাত ও চিনি, কম শারীরিক পরিশ্রম, ব্যাপক তামাক ব্যবহার এবং উচ্চ মানসিক চাপ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ কোলেস্টেরল প্রায়ই কোনো উপসর্গ ছাড়াই বছরের পর বছর নীরবে বাড়ে এবং ধীরে ধীরে হৃদয়ে রক্ত পৌঁছে দেওয়া রক্তনালীগুলোর ক্ষতি করে। এই ঝুঁকিগুলো নীরব বলেই সতর্ক-সংকেতের জন্য অপেক্ষা না করে প্রতিরোধ ও নিয়মিত পরীক্ষা বেশি জরুরি।
হার্ট-সুস্থ খাবার কেমন হওয়া উচিত?
খাবার আপনার হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারগুলোর একটি। সাধারণ বাঙালি পাতে ছোট, দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনই বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
- পাতের অর্ধেক শাকসবজি দিয়ে ভরুন এবং প্রতিদিন ফল রাখুন।
- প্রায়ই মাছ ও ডাল বেছে নিন, আর মাংসের দৃশ্যমান চর্বি ও চামড়া বাদ দিন।
- সাদা ভাতের পরিমাণ কমান এবং লাল চাল বা গোটা শস্য যোগ করুন।
- ভাজা খাবার, ডালডা ও বারবার ব্যবহার করা তেল কমান; তেল মেপে ব্যবহার করুন।
- বাড়তি লবণ এবং খুব মিষ্টি পানীয় ও মিষ্টি কমান।
হৃদয়ের জন্য কতটা ব্যায়াম দরকার?
জিমের দরকার নেই। সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন প্রায় ৩০ মিনিট জোরে হাঁটা, সাইকেল চালানো বা ঘর ও মাঠের কাজের মতো এমন কিছু করুন যা হৃৎস্পন্দন বাড়ায়। খাবারের পর হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার এবং দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা কমানো—সবই সাহায্য করে। অল্প হলেও নিয়মিত চলাফেরা রক্তচাপ কমায়, কোলেস্টেরল ভালো রাখে এবং ওজন ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
ধূমপান, মানসিক চাপ ও ওজনের কী হবে?
সিগারেট, বিড়ি ও জর্দাসহ সব ধরনের তামাক ছেড়ে দেওয়া আপনার হৃদয়ের জন্য নেওয়া সবচেয়ে ভালো কাজগুলোর একটি; উপকার শুরু হয় কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও কম ঘুম সময়ের সঙ্গে রক্তচাপ বাড়ায়, তাই প্রতিদিনের বিশ্রাম, প্রার্থনা বা প্রশান্তি এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো বিলাসিতা নয়, বরং সুরক্ষা। সামান্য বাড়তি ওজন, বিশেষ করে পেটের চারপাশের, কমালেও হৃদয়ের ওপর চাপ কমে।
নিজের সংখ্যাগুলো কেন জানবেন?
যেহেতু হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায়ই নীরব, ধরার একমাত্র উপায় পরীক্ষা করা। প্রাপ্তবয়স্কদের নিজের রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল জানা উচিত এবং পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত তা যাচাই করানো উচিত। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে ঠিক যেমন বলা হয়েছে তেমনভাবে চিকিৎসা নিন এবং কখনো নিজে নিজে বন্ধ করবেন না। নির্ধারিত হার্ট ও প্রেশারের ওষুধ মেডিসিন ডিরেক্টরিতে খুঁজে দেখতে পারেন, তবে মাত্রার বিষয়ে সবসময় ডাক্তারের নির্দেশ মেনে চলুন। পরিবারের রোগের ইতিহাস জানাও আপনার ডাক্তারকে ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপ, শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করান, বিশেষ করে পরিবারে হৃদরোগ থাকলে। বুকে ব্যথা বা চাপ, ব্যথা হাত-ঘাড়-চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া দেখলে সঙ্গে সঙ্গে জরুরি চিকিৎসা নিন, কারণ এগুলো হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে এবং প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ (কার্ডিওলজিস্ট) বা চিকিৎসক খুঁজে নিতে পারেন আমাদের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দেখুন তালিকা থেকে এবং হৃদয় রক্ষা নিয়ে পড়ুন আরও স্বাস্থ্য টিপস।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
কোন বয়স থেকে হৃদয়ের সংখ্যাগুলো পরীক্ষা শুরু করব?
অনেক প্রাপ্তবয়স্কের ত্রিশের কোঠা থেকে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল জেনে রাখা উপকারী, আর পরিবারে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে আরও আগে থেকেই। ফলাফল অনুযায়ী কত ঘন ঘন আবার পরীক্ষা করবেন তা ডাক্তার বলে দিতে পারেন।
তরুণদের কি হৃদরোগ হতে পারে?
হ্যাঁ। বাংলাদেশে ত্রিশ ও চল্লিশের কোঠার মানুষের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক ক্রমেই বেশি দেখা যাচ্ছে, যা প্রায়ই ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িত। আগেভাগে সুস্থ অভ্যাস গড়াই সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা।
রক্তচাপ স্বাভাবিক মনে হলে কি ওষুধ বন্ধ করতে পারি?
না। রক্তচাপ ও অনেক হৃদরোগ ওষুধে নিয়ন্ত্রণে থাকে, সারে না, আর ভালো লাগা মানেই বন্ধ করা নিরাপদ নয়। হঠাৎ বন্ধ করা বিপজ্জনক হতে পারে। যেকোনো পরিবর্তন সবসময় ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করুন, আর ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল দিয়ে আপনার চিকিৎসার রেকর্ড রাখতে পারেন।
শুধু হাঁটা কি সত্যিই হৃদয় রক্ষায় যথেষ্ট?
বেশিরভাগ মানুষের জন্য বেশিরভাগ দিন প্রায় ৩০ মিনিট জোরে হাঁটা সত্যিই উপকারী এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এটি তীব্র হতে হবে না; গতির চেয়ে ধারাবাহিকতাই বেশি জরুরি।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।