ডায়াবেটিক চোখের রোগ: পরীক্ষায় দৃষ্টি রক্ষা
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস খুবই সাধারণ, আর এর সবচেয়ে গুরুতর অথচ প্রতিরোধযোগ্য জটিলতাগুলোর একটি হলো চোখের ক্ষতি। বেশি রক্তসুগার ধীরে ধীরে রেটিনার সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলোকে নষ্ট করে—রেটিনা হলো চোখের পেছনের আলো-সংবেদী স্তর। একে বলে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, এবং সময়মতো ধরা না পড়লে এটি অন্ধত্ব ডেকে আনতে পারে। আশার কথা হলো, বছরে একবার সাধারণ চোখ পরীক্ষা ও সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখলে ডায়াবেটিসের বেশিরভাগ রোগীর দৃষ্টি রক্ষা পায়। ঝুঁকি জানা থাকলে ক্ষতি স্থায়ী হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ডায়াবেটিক চোখের রোগ কী?
বছরের পর বছর রক্তসুগার বেশি থাকলে রেটিনার সূক্ষ্ম নালীগুলো দুর্বল হয়ে যায়, তরল বা রক্ত চুঁইয়ে পড়ে এবং অস্বাভাবিকভাবে নতুন নালী গজাতে পারে। প্রথমদিকে সাধারণত কোনো উপসর্গই থাকে না, তাই চোখ আক্রান্ত হয়ে গেছে শুনে অনেকেই অবাক হন। সময়ের সঙ্গে এটি ঝাপসা দৃষ্টি, রেটিনার কেন্দ্রে ফোলা বা চোখের ভেতরে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে। ডায়াবেটিস ছানি ও গ্লুকোমার ঝুঁকিও বাড়ায়, তাই পুরো চোখেরই যত্ন দরকার।
সতর্ক-সংকেত কী কী?
যেহেতু প্রাথমিক ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি নীরব, তাই উপসর্গের জন্য অপেক্ষা না করে পরীক্ষা করানোই বেশি জরুরি। বাড়লে যা লক্ষ্য করতে পারেন:
- ঝাপসা বা ওঠানামা করা দৃষ্টি।
- চোখের সামনে কালো দাগ, ভাসমান বিন্দু বা মাকড়সার জালের মতো আকৃতি।
- রাতে দেখতে বা রং আলাদা করতে অসুবিধা।
- দৃষ্টির ঠিক মাঝখানে কালো বা ফাঁকা অংশ।
- এক চোখে হঠাৎ দৃষ্টি হারানো, যা জরুরি অবস্থা।
বছরে পরীক্ষা কেন জরুরি?
প্রাথমিক ক্ষতির বেশিরভাগই কেবল ডাক্তার চোখের মণি বড় করে চোখের পেছন দেখে শনাক্ত করতে পারেন। দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার সময় রোগটি প্রায়ই অনেক বেড়ে যায় ও চিকিৎসা কঠিন হয়। বছরে একবার মণি বড় করে চোখ পরীক্ষা করলে সমস্যা চিকিৎসাযোগ্য অবস্থায় ধরা পড়ে এবং বেশিরভাগ গুরুতর দৃষ্টিক্ষয় ঠেকানো যায়। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রত্যেকের রোগ ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং টাইপ-১ রোগীদের পাঁচ বছরের মধ্যে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত, এরপর বছরে অন্তত একবার। ডায়াবেটিসসহ গর্ভবতী নারীদের আরও ঘন ঘন পরীক্ষা দরকার। চোখের যত্নের পাশাপাশি ডায়াবেটিস সামলানোর জন্য আরও স্বাস্থ্য টিপস পড়ুন।
দৃষ্টি কীভাবে রক্ষা করবেন?
প্রতিদিনের ভালো নিয়ন্ত্রণ যেকোনো একক চিকিৎসার চেয়ে চোখের জন্য বেশি কাজ করে। কার্যকর পদক্ষেপ:
- রক্তসুগার লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখুন এবং পরামর্শমতো মাপুন।
- রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন, এগুলোও রেটিনার নালী নষ্ট করে।
- নিয়মিত ওষুধ নিন; মেটফরমিন-এর মতো ওষুধ আমাদের মেডিসিন ডিরেক্টরিতে যাচাই করে নিতে পারেন।
- ধূমপান ছাড়ুন, সুষম খাবার খান ও সক্রিয় থাকুন।
- দৃষ্টি ভালো মনে হলেও বছরের চোখ পরীক্ষা কখনো বাদ দেবেন না।
ডাক্তার চিকিৎসা লিখলে ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল দিয়ে গোছানো রেকর্ড রাখতে পারেন। বেড়ে যাওয়া রেটিনোপ্যাথির চিকিৎসা হয় লেজার, চোখের ভেতরে ইনজেকশন বা অপারেশন দিয়ে, যেগুলো আগেভাগে শুরু করলেই সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
রুটিন বছরের পরীক্ষার জন্য, কিংবা ঝাপসা দৃষ্টি, ভাসমান বিন্দু বা রং ফ্যাকাশে লাগলে তার আগেই চক্ষু বিশেষজ্ঞ দেখান। হঠাৎ দৃষ্টি হারানো, হঠাৎ অনেক নতুন ভাসমান বিন্দু, আলোর ঝলকানি বা চোখের সামনে পর্দা নেমে আসা হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণ বা রেটিনা সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে, যা দ্রুত দৃষ্টিকে হুমকিতে ফেলে। যোগ্য চক্ষু বিশেষজ্ঞ খুঁজে নিতে পারেন আমাদের নিবন্ধিত ডাক্তারের তালিকা থেকে। এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়, নিজের যত্নের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
দৃষ্টি ভালো থাকলেও কি চোখ পরীক্ষা দরকার?
হ্যাঁ। প্রাথমিক ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিতে সাধারণত কোনো উপসর্গ থাকে না, তাই ভালো দৃষ্টি মানেই সুস্থ চোখ নয়। বছরে একবার মণি বড় করে পরীক্ষা লুকানো ক্ষতি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থায় ধরে ফেলে।
সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখলে কি ক্ষতি ঠিক হয়ে যায়?
ভালো নিয়ন্ত্রণ আরও ক্ষতি ধীর বা বন্ধ করতে পারে এবং এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, তবে আগেই হয়ে যাওয়া পরিবর্তন পুরোপুরি না-ও ফিরতে পারে। এ কারণেই আগেভাগে শনাক্ত করা এত জরুরি।
ডায়াবেটিসের রোগীর কত ঘন ঘন চোখ পরীক্ষা দরকার?
বেশিরভাগের জন্য বছরে অন্তত একবার, আর ডাক্তার পরিবর্তন পেলে বা গর্ভবতী হলে আরও ঘন ঘন। টাইপ-২ রোগীদের রোগ ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং টাইপ-১ রোগীদের পাঁচ বছরের মধ্যে পরীক্ষা করানো উচিত।
ডায়াবেটিক চোখের রোগ কি নতুন চশমার দরকারের মতো?
না। নতুন চশমা ফোকাস ঠিক করে, কিন্তু ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি রেটিনার নিজের ক্ষতি। এটি চশমায় সারে না, এর জন্য সঠিক চোখ পরীক্ষা ও চিকিৎসা দরকার।