ChamberBD Logo ChamberBD
See in English

পাকস্থলীর ক্যান্সার: বিপদচিহ্ন ও ঝুঁকির কারণ

পাকস্থলীর (গ্যাস্ট্রিক) ক্যান্সার প্রায়ই চুপচাপ বাড়ে, আর এর প্রথম দিকের লক্ষণগুলো বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিদিনের সাধারণ বদহজমের মতোই দেখায়। এই মিলটাই আসল বিপদ—মানুষ মাসের পর মাস অ্যান্টাসিড খান, আর রোগ অনেকটা ছড়িয়ে পড়ার পরই সাহায্য নেন। আশার কথা হলো, পাকস্থলীর ক্যান্সার প্রথম দিকে ধরা পড়লে চিকিৎসা অনেক ভালো কাজ করে। বিপদচিহ্ন আর নিজের ঝুঁকির কারণগুলো জানাই বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

পাকস্থলীর ক্যান্সার কী?

পাকস্থলীর ভেতরের আবরণের কোষ অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে টিউমার তৈরি করলে তাকে পাকস্থলীর ক্যান্সার বলে। এটি সাধারণত বছরের পর বছর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, প্রায়ই দীর্ঘদিনের প্রদাহ থেকে শুরু হয়। পঞ্চাশ বছরের পর এটি বেশি দেখা যায় এবং নারীর তুলনায় পুরুষে কিছুটা বেশি হয়, যদিও যেকোনো বয়সেই হতে পারে। শুরুতে তীব্র ব্যথা না থাকায় একে সহজেই অবহেলা করা হয়।

বিপদচিহ্ন কী কী?

বেশিরভাগ বদহজম ক্ষতিকর নয়, তবে কিছু লক্ষণ ঠিকমতো পরীক্ষা করানো দরকার—বিশেষত যদি তা নতুন হয়, দীর্ঘস্থায়ী হয় বা বাড়তে থাকে:

  • সপ্তাহের পর সপ্তাহ থাকা বদহজম বা জ্বালাপোড়া, যা সাধারণ ওষুধে কমে না।
  • অল্প খাবার খেয়েই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি।
  • চেষ্টা ছাড়াই ওজন বা ক্ষুধা কমে যাওয়া।
  • একটানা বমিভাব, বমি, কিংবা বমির সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
  • কালো আলকাতরার মতো পায়খানা, অথবা রক্তস্বল্পতার কারণে অকারণ ক্লান্তি।
  • খাবার গিলতে কষ্ট বা ব্যথা হওয়া।

মাঝেমধ্যে একবার অম্বল হওয়া দুশ্চিন্তার কিছু নয়। যেসব লক্ষণ কয়েক সপ্তাহ ধরে থেকে যায়, কিংবা ওজন কমা ও রক্তপাতের সঙ্গে আসে—সেগুলোই খেয়াল করা দরকার।

কী কারণে হয় ও কাদের ঝুঁকি বেশি?

ক্যান্সার কখনোই হুবহু আগে থেকে বলা যায় না, তবে আমাদের পরিবেশে কয়েকটি বিষয় ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘদিনের হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি (এইচ. পাইলোরি) সংক্রমণ—যা বাংলাদেশে খুবই সাধারণ একটি পাকস্থলীর জীবাণু—এর সঙ্গে সবচেয়ে শক্ত সম্পর্ক আছে। বেশি লবণযুক্ত, ধোঁয়ায় শুকানো, আচার ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং কম শাকসবজি-ফলমূলের খাদ্যাভ্যাসও ঝুঁকি বাড়ায়। ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, দীর্ঘদিনের অচিকিৎসিত গ্যাস্ট্রাইটিস বা পাকস্থলীর আলসার এবং পরিবারে এ রোগের ইতিহাস—সবই ঝুঁকি বাড়ায়। এইচ. পাইলোরি ধরা পড়লে চিকিৎসা করালে এই ঝুঁকি কমে।

কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন?

প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস সত্যিই পাকস্থলীকে রক্ষা করতে সাহায্য করে:

  • বেশি করে তাজা শাকসবজি, ফল ও আঁশ খান এবং বেশি লবণ, ধোঁয়ায় শুকানো ও বেশি সংরক্ষিত খাবার কমিয়ে দিন।
  • ধূমপান করবেন না এবং মদ্যপান সীমিত রাখুন।
  • দীর্ঘদিন অম্বল থাকলে, বিশেষত পারিবারিক ইতিহাস থাকলে, এইচ. পাইলোরির পরীক্ষা ও চিকিৎসা করান।
  • মেডিসিন ডিরেক্টরিতে থাকা অ্যাসিড কমানোর ওষুধ (যেমন ওমিপ্রাজল) নিজে নিজে দিনের পর দিন না খেয়ে কেবল ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খান, কারণ এগুলো গুরুতর লক্ষণ ঢেকে দিতে পারে।
  • বারবার পাকস্থলীর সংক্রমণ এড়াতে খাবার পরিষ্কারভাবে রান্না ও সংরক্ষণ করুন।

কীভাবে ধরা পড়ে ও চিকিৎসা হয়?

সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা হলো এন্ডোস্কোপি, যেখানে একটি সরু ক্যামেরা সরাসরি পাকস্থলীর ভেতরের আবরণ দেখে এবং দরকার হলে সামান্য টিস্যু (বায়োপসি) নেয়। ক্যান্সার নিশ্চিত হলে অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি বা ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের ঠিক করা অন্যান্য চিকিৎসা লাগতে পারে। যত আগে ধরা পড়ে, চিকিৎসা সাধারণত তত সহজ ও সফল হয়—এ কারণেই দীর্ঘস্থায়ী লক্ষণ কখনো অবহেলা করা উচিত নয়।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

চিকিৎসা সত্ত্বেও বদহজম দুই-তিন সপ্তাহের বেশি থাকলে, কিংবা অকারণ ওজন কমা, একটানা বমি, খাবার গিলতে কষ্ট বা নতুন ক্লান্তি থাকলে ডাক্তার দেখান। বমির সঙ্গে রক্ত গেলে, কালো আলকাতরার মতো পায়খানা হলে বা পেটে তীব্র একটানা ব্যথা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। আমাদের নিবন্ধিত ডাক্তারের তালিকা থেকে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বা সার্জন খুঁজে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দেখুন, আর হজম-স্বাস্থ্য নিয়ে আরও স্বাস্থ্য টিপস পড়তে পারেন। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য লক্ষণগুলো গুছিয়ে লিখতে চাইলে ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল কাজে লাগাতে পারেন।

এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়, নিজের লক্ষণ নিয়ে অবশ্যই একজন যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

দীর্ঘদিনের গ্যাস্ট্রিক সমস্যা কি সবসময় ক্যান্সারে রূপ নেয়?

না। অম্বল বা গ্যাস্ট্রাইটিসে ভোগা বেশিরভাগ মানুষের কখনোই ক্যান্সার হয় না। উদ্বেগ কেবল তখনই, যখন লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হয়, বাড়তে থাকে বা ওজন কমা-রক্তপাতের মতো বিপদচিহ্নের সঙ্গে আসে—তখন এন্ডোস্কোপি দরকার।

এইচ. পাইলোরি কি বিপজ্জনক এবং এর চিকিৎসা আছে কি?

এইচ. পাইলোরি খুবই সাধারণ এবং অধিকাংশ বাহকই সুস্থ থাকেন, তবে কারও কারও ক্ষেত্রে এটি আলসার করে ও দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ডাক্তারের দেওয়া অল্প কয়েক দিনের অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যাসিড কমানোর ওষুধে সাধারণত এটি ভালো হয়ে যায়।

পাকস্থলীর ক্যান্সার কি পুরোপুরি প্রতিরোধ করা যায়?

এর নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না, তবে তাজা ও কম লবণের খাবার, ধূমপান না করা এবং এইচ. পাইলোরির চিকিৎসা উল্লেখযোগ্যভাবে ঝুঁকি কমায়। দীর্ঘস্থায়ী লক্ষণ দ্রুত পরীক্ষা করানো হলো এর পরের সেরা সুরক্ষা।

কোন বয়সে বেশি সতর্ক থাকা উচিত?

পঞ্চাশের পর ঝুঁকি বাড়ে, তবে পারিবারিক ইতিহাস বা দীর্ঘদিনের পাকস্থলীর লক্ষণ থাকলে আগেই সতর্ক থাকা এবং ডাক্তারের সঙ্গে স্ক্রিনিং নিয়ে আলোচনা করা উচিত।

এই তথ্যটি কি আপনার কাজে লেগেছে?