ChamberBD Logo ChamberBD
See in English

ফুসফুসের ক্যান্সার: ধূমপান, লক্ষণ ও আগাম সংকেত

ফুসফুসের ক্যান্সার বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ ও গুরুতর ক্যান্সারগুলোর একটি, এবং বাংলাদেশেও এটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়। ফুসফুসের কোষ যখন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকে—সাধারণত সিগারেটের ধোঁয়া বা দূষিত বাতাসে বছরের পর বছর ক্ষতির পর—তখন এটি হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়ই খুব কম উপসর্গ থাকায় এটি প্রায়ই দেরিতে ধরা পড়ে, তাই প্রতিরোধ ও আগাম শনাক্তকরণ এত গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক সত্য হলো, বেশিরভাগ ফুসফুসের ক্যান্সারই প্রতিরোধযোগ্য, আর যে কোনো বয়সে তামাক ছাড়লে ঝুঁকি কমে। কারণ ও আগাম লক্ষণ বোঝা আপনার ফুসফুস রক্ষায় সত্যিকারের শক্তি দেয়।

ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণ কী?

তামাক ধূমপানই সবচেয়ে বড় কারণ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর জন্য দায়ী। সিগারেট, বিড়ি ও হুক্কা—প্রতিটি টানেই কোমল ফুসফুসের কোষের ক্ষতি করে। অন্যের ধোঁয়া শ্বাসে নেওয়া, যাকে পরোক্ষ ধূমপান বলে, তা-ও বিপজ্জনক, বিশেষ করে শিশু ও ধূমপান না করা স্বজনদের জন্য। বাংলাদেশে শহরের উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ, রান্নার চুলার ভেতরের ধোঁয়া এবং কর্মস্থলের ধুলা ও রাসায়নিক ঝুঁকি আরও বাড়ায়। কদাচিৎ যাঁরা কখনো ধূমপান করেননি তাঁদেরও ফুসফুসের ক্যান্সার হয়, তাই উপসর্গ কখনো উপেক্ষা করা উচিত নয়।

আগাম বিপদচিহ্ন কী কী?

ফুসফুসের ক্যান্সার শুরুতে নীরব থাকতে পারে, তাই দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ—বিশেষ করে বর্তমান বা সাবেক ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে—পরীক্ষা করানো দরকার। নিচের লক্ষণ দেখলে ডাক্তার দেখান:

  • যে কাশি সারছে না বা সপ্তাহের পর সপ্তাহ বেড়েই চলেছে।
  • কাশির সঙ্গে রক্ত, সামান্য হলেও।
  • একটানা বুকে ব্যথা, যা গভীর শ্বাস বা কাশিতে বাড়তে পারে।
  • আগে ছিল না এমন নতুন শ্বাসকষ্ট বা সাঁই-সাঁই শব্দ।
  • কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী গলা ভাঙা।
  • বারবার ফিরে আসা বুকের সংক্রমণ।
  • কারণ ছাড়া ওজন কমা, অরুচি ও সারাক্ষণ ক্লান্তি।

দীর্ঘদিনের কাশি সহজেই উপেক্ষা করা হয়, কিন্তু তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী যে কোনো কাশির জন্য আরেক বোতল কাশির সিরাপের বদলে ডাক্তারের পরামর্শ দরকার।

কাদের ঝুঁকি বেশি?

যাঁরা ধূমপান করেন বা করতেন, তাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, আর যত বছর ও যত বেশি ধূমপান, ঝুঁকি তত বাড়ে। দীর্ঘদিন পরোক্ষ ধূমপান, তীব্র বায়ুদূষণ, রান্নার চুলার ধোঁয়া এবং কিছু কর্মস্থলের উপাদানের সংস্পর্শও ঝুঁকি বাড়ায়। পরিবারে ফুসফুসের ক্যান্সারের ইতিহাস ও বেশি বয়স তা আরও বাড়ায়। গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, যত দিনই ধূমপান করে থাকুন না কেন, ছাড়ার পর থেকেই ঝুঁকি কমতে শুরু করে।

কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন?

ফুসফুস রক্ষা শুরু হয় প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত থেকে, আর সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো কখনো ধূমপান শুরু না করা, কিংবা করলে তা ছেড়ে দেওয়া:

  • সিগারেট, বিড়ি ও হুক্কাসহ সব ধরনের তামাক ছাড়ুন এবং দরকার হলে ডাক্তারের সহায়তা নিন।
  • শিশু ও পরিবারকে রক্ষা করতে ঘর ও গাড়ি ধোঁয়ামুক্ত রাখুন।
  • রান্নাঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করে এবং যথাসম্ভব ধোঁয়াটে চুলা এড়িয়ে ঘরের বাতাস উন্নত করুন।
  • বেশি দূষণের দিনে মাস্ক পরুন এবং দূষণ বেশি থাকলে বাইরে কম সময় কাটান।
  • প্রচুর ফল ও শাকসবজি খান এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী কাশি, কাশির সঙ্গে রক্ত, একটানা বুকে ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী গলা ভাঙা, নতুন শ্বাসকষ্ট, কিংবা কারণ ছাড়া ওজন কমলে দ্রুত ডাক্তার দেখান—বিশেষ করে আপনি যদি ধূমপান করেন বা করতেন। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট, কাশির সঙ্গে প্রচুর রক্ত, কিংবা হঠাৎ তীব্র বুকে ব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। বুকের এক্স-রে বা সিটি স্ক্যানসহ আগেভাগে পরীক্ষা কার্যকর চিকিৎসার সবচেয়ে বড় সুযোগ দেয়। বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ (পালমোনোলজিস্ট) বা অনকোলজিস্ট খুঁজে নিতে পারেন আমাদের প্রাসঙ্গিক বিশেষজ্ঞ তালিকা থেকে। ধূমপান ছাড়ার সময় ডাক্তার কোনো সহায়ক ওষুধ দিলে তা আমাদের মেডিসিন ডিরেক্টরিতে যাচাই করে নিতে পারেন, আর ভিজিটের রেকর্ড পরিপাটি রাখতে আমাদের ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল ব্যবহার করতে পারেন। তামাক ছাড়া ও ফুসফুসের স্বাস্থ্য নিয়ে আরও জানতে দেখুন আমাদের আরও স্বাস্থ্য টিপস

সচরাচর জিজ্ঞাসা

যাঁরা ধূমপান করেন না, তাঁদের কি ফুসফুসের ক্যান্সার হতে পারে?

হ্যাঁ, যদিও তা অনেক কম দেখা যায়। পরোক্ষ ধূমপান, বায়ুদূষণ, রান্নার ধোঁয়া এবং কিছু কর্মস্থলের সংস্পর্শ ধূমপান না করা মানুষেরও ফুসফুসের ক্যান্সার ঘটাতে পারে। তাই ধূমপানের ইতিহাস যা-ই হোক, দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ পরীক্ষা করানো উচিত।

অনেক বছর ধূমপান করেছি, এখন ছাড়লে কি লাভ হবে?

অবশ্যই। ধূমপান ছাড়ার পর থেকেই ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমতে শুরু করে, আর যত বেশি দিন ধোঁয়ামুক্ত থাকবেন ঝুঁকি তত কমে। ছাড়লে শ্বাস-প্রশ্বাস ভালো হয়, হৃদরোগের ঝুঁকি কমে এবং পুরো পরিবার উপকৃত হয়।

বিড়ি ও হুক্কা কি সিগারেটের চেয়ে নিরাপদ?

না। বিড়ি ও হুক্কাও ফুসফুসে ক্ষতিকর ধোঁয়া ও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক পৌঁছে দেয়, আর হুক্কার এক বসায় প্রচুর ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসা যায়। সব ধরনের তামাক ধূমপানই ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

দীর্ঘদিনের কাশি মানেই কি ফুসফুসের ক্যান্সার?

না। বেশিরভাগ দীর্ঘস্থায়ী কাশি ক্যান্সার নয়, বরং সংক্রমণ, হাঁপানি, অ্যালার্জি বা অন্য কারণে হয়। তবু তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী কাশি, কিংবা কাশির সঙ্গে রক্ত গেলে নিরাপত্তার জন্য ডাক্তারের পরীক্ষা করানো উচিত।

এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। নিজের অবস্থা সম্পর্কে যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

এই তথ্যটি কি আপনার কাজে লেগেছে?