হার্নিয়া: লক্ষণ, ধরন ও কখন অপারেশন দরকার
হার্নিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রচলিত অস্ত্রোপচারজনিত সমস্যা, তবু অপারেশনের ভয়ে বা নিজে থেকে ভালো হয়ে যাবে এই আশায় অনেকে বছরের পর বছর ফোলা নিয়ে কাটিয়ে দেন। কিন্তু এটি নিজে থেকে সারে না। হার্নিয়া হয় তখন, যখন কোনো অঙ্গ বা চর্বিযুক্ত কলা পেশির দেয়ালের দুর্বল জায়গা দিয়ে ঠেলে বেরিয়ে আসে, ফলে একটি নরম দলা তৈরি হয়—যা দাঁড়ালে বা চাপ দিলে দেখা যায় এবং শুয়ে পড়লে মিলিয়ে যায়। এর ধরন ও সতর্ক-সংকেত জানা থাকলে ছোট, সহজে সারানোর হার্নিয়া জরুরি অবস্থায় রূপ নেওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
হার্নিয়া কী এবং কেমন অনুভব হয়?
পেটের পেশির দেয়ালকে একটি শক্ত চাদর হিসেবে ভাবুন, যা অন্ত্রকে গুছিয়ে ভেতরে ধরে রাখে। এতে ছোট ফাঁক বা দুর্বল জায়গা তৈরি হলে ভেতরের অংশ বাইরের দিকে ঠেলে আসে—অনেকটা পুরোনো টায়ারের ফাঁক দিয়ে টিউব বেরিয়ে আসার মতো। বেশিরভাগ মানুষ প্রথমে কুঁচকিতে, নাভির আশপাশে বা পুরোনো অপারেশনের দাগের জায়গায় নরম ফোলা লক্ষ করেন। শুরুতে ব্যথাহীন হতে পারে, কিংবা দিনশেষে ভারী, টানটান ব্যথা বাড়ে এবং শুয়ে পড়লে কমে।
হার্নিয়ার সাধারণ ধরন কী কী?
হার্নিয়ার নামকরণ হয় কোথায় দেখা দিচ্ছে তার ওপর:
- ইনগুইনাল হার্নিয়া কুঁচকিতে—সবচেয়ে সাধারণ, বিশেষ করে পুরুষদের।
- আম্বিলিক্যাল হার্নিয়া নাভিতে—শিশুদের এবং সন্তান জন্মের পর নারীদের প্রায়ই হয়।
- ইনসিশনাল হার্নিয়া আগের অপারেশনের দাগ দিয়ে।
- হায়াটাস হার্নিয়া—যেখানে পাকস্থলীর কিছু অংশ বুকের দিকে উঠে গিয়ে অম্লতা ও রিফ্লাক্স সৃষ্টি করে।
কী কারণে হার্নিয়া হয় বা বাড়ে?
যা কিছু বারবার পেটের ভেতরের চাপ বাড়ায়, তা-ই দুর্বল জায়গা দিয়ে কলা ঠেলে দিতে পারে। আমাদের পরিবেশে সাধারণ কারণগুলো হলো কর্মক্ষেত্রে ভারী জিনিস তোলা, ধূমপান বা হাঁপানির দীর্ঘস্থায়ী কাশি, দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য ও টয়লেটে কোঁথ দেওয়া, স্থূলতা এবং গর্ভাবস্থার চাপ। পেশির ফাঁক খোলা থাকে বলে হার্নিয়া নিজে থেকে সারে না, তবে এই চাপগুলো এড়ালে এটি দ্রুত বড় হওয়া ঠেকানো যায়।
অপারেশনের আগে হার্নিয়ার যত্ন কীভাবে নেবেন?
অপারেশনই একমাত্র স্থায়ী চিকিৎসা, তবে সঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকার সময় আপনি অস্বস্তি ও ঝুঁকি কমাতে পারেন। ভারী জিনিস তোলা এড়িয়ে চলুন, কাশির চিকিৎসা আগেই করুন এবং কোঁথ এড়াতে আঁশযুক্ত খাবার ও পর্যাপ্ত পানি দিয়ে পায়খানা নরম রাখুন। বাড়তি ওজন কমালে পেশির দেয়ালের ওপর চাপ কমে। অম্লতা সৃষ্টিকারী হায়াটাস হার্নিয়া প্রায়ই খাদ্যাভ্যাস ও মেডিসিন ডিরেক্টরিতে থাকা ওমিপ্রাজলের মতো অ্যাসিড কমানোর ওষুধে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তবে শুধু ডাক্তারের পরামর্শে। বেল্ট বা ট্রাস সাময়িক সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু এটি সমাধান নয় এবং ভুলভাবে ব্যবহার করলে ক্ষতিও করতে পারে।
আটকে যাওয়া হার্নিয়ার বিপদ-সংকেত কী?
সবচেয়ে গুরুতর জটিলতা হলো অন্ত্রের একটি অংশ আটকে গিয়ে (ইনকার্সারেটেড) তার রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া (স্ট্র্যাঙ্গুলেটেড)। এটি একটি অস্ত্রোপচারজনিত জরুরি অবস্থা, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। নিচের লক্ষণ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে জরুরি চিকিৎসা নিন, যদি হার্নিয়া:
- হঠাৎ ব্যথাযুক্ত, শক্ত, লালচে বা স্পর্শকাতর হয়ে যায়।
- আগে শুলে মিলিয়ে যেত, কিন্তু এখন আর ভেতরে ঠেলে দেওয়া যায় না।
- সঙ্গে বমি, তীব্র পেটব্যথা, জ্বর বা বায়ু-পায়খানা বন্ধ থাকে।
অপারেশনের জন্য কখন ডাক্তার দেখাবেন?
ব্যথাহীন হার্নিয়াও পরীক্ষা করানো উচিত, কারণ পরিকল্পিত অপারেশন স্ট্র্যাঙ্গুলেটেড হার্নিয়ার জরুরি অপারেশনের চেয়ে অনেক নিরাপদ ও সহজ। আধুনিক মেরামত—প্রায়ই জাল (মেশ) দিয়ে এবং কখনো ছিদ্র করে (কিহোল) করা হয়—খুবই কার্যকর এবং সাধারণত দ্রুত সেরে ওঠা যায়। ভয়ে দেরি করবেন না; সময় নিয়ে একজন যোগ্য সার্জনের সঙ্গে আলোচনা করুন। নিবন্ধিত জেনারেল সার্জন খুঁজে একজন বিশেষজ্ঞ দেখান, আর আপনার সার্জন আমাদের ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল দিয়ে পরিষ্কার পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন। হজম ও অস্ত্রোপচারজনিত স্বাস্থ্য নিয়ে আরও জানতে দেখুন আমাদের আরও স্বাস্থ্য টিপস।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
হার্নিয়া কি অপারেশন ছাড়া সারে?
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে না। পেশির দেয়ালের ফাঁক নিজে থেকে বন্ধ হয় না, তাই অপারেশন ছাড়া হার্নিয়া মিলিয়ে যায় না। স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এর বৃদ্ধি ধীর করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী চিকিৎসা একমাত্র অপারেশন।
হার্নিয়ার অপারেশন কি বিপজ্জনক?
পরিকল্পিত হার্নিয়া অপারেশন একটি সাধারণ, নিরাপদ ও কার্যকর অস্ত্রোপচার এবং বেশিরভাগ মানুষ দ্রুত সেরে ওঠেন। আটকে যাওয়া হার্নিয়ার জরুরি অবস্থার জন্য অপেক্ষা করার চেয়ে এটি অনেক বেশি নিরাপদ।
বেল্ট বা ট্রাস পরলে কি হার্নিয়া সারবে?
না। বেল্ট বা ট্রাস সাময়িক সহায়তা ও আরাম দিতে পারে, কিন্তু পেশির ফাঁক মেরামত করে না। ভুলভাবে ব্যবহার করলে ক্ষতিও হতে পারে, তাই এটি সঠিক পরীক্ষার বিকল্প নয়।
ভারী জিনিস তুললে কি হার্নিয়া হয়?
বারবার ভারী জিনিস তুললে পেটের ভেতরের চাপ বাড়ে এবং দুর্বল জায়গা দিয়ে কলা ঠেলে বেরোতে পারে, বিশেষ করে আগে থেকে দুর্বলতা থাকলে। নিরাপদে ভার তোলা এবং কাশি ও কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসা ঝুঁকি কমায়।