ChamberBD Logo ChamberBD
See in English

হেপাটাইটিস এ ও ই: দূষিত খাবারে জন্ডিস

বাংলাদেশে প্রতি বছর গরমকাল ও বর্ষার শুরুতে জন্ডিসের প্রকোপ বাড়ে, এবং এর বড় একটি অংশের কারণ হেপাটাইটিস এ ও হেপাটাইটিস ই। দুটোই লিভারের সংক্রমণ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির মলের সামান্য অংশ দূষিত খাবার, পানি বা অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে মুখে পৌঁছালে ছড়ায়। ভালো খবর হলো, বিশ্রাম ও যত্নে বেশিরভাগ মানুষই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। গুরুত্বপূর্ণ হলো সতর্ক-সংকেত চেনা, গর্ভবতী নারীদের রক্ষা করা এবং ঘরেই সংক্রমণ ঠেকানো।

হেপাটাইটিস এ ও ই কী?

হেপাটাইটিস মানে লিভারের প্রদাহ। হেপাটাইটিস এ ও ই হলো এমন দুটি ভাইরাস, যা অল্প সময়ের জন্য লিভারে প্রদাহ ঘটায়। হেপাটাইটিস বি ও সি-এর মতো এগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণে রূপ নেয় না এবং মূলত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায় না। বরং এগুলো "খাবার ও পানির" ভাইরাস, যেখানে খাবার পানি, রাস্তার খাবার বা স্যানিটেশন পুরোপুরি নিরাপদ নয় সেখানে বেশি দেখা যায়। হেপাটাইটিস এ-তে আক্রান্ত হলে সাধারণত শরীরে আজীবন প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।

উপসর্গ কী কী?

ভাইরাস শরীরে ঢোকার দুই থেকে ছয় সপ্তাহ পর সাধারণত উপসর্গ দেখা দেয়। অনেক শিশুর অসুস্থতা খুব মৃদু হয়, আর বড়দের কষ্ট বেশি হয়।

  • চোখ ও ত্বক হলুদ হওয়া (জন্ডিস) এবং গাঢ়, চায়ের মতো রঙের প্রস্রাব।
  • ফ্যাকাশে বা সাদাটে রঙের পায়খানা।
  • ক্লান্তি, দুর্বলতা ও ক্ষুধামন্দা।
  • বমি বমি ভাব, বমি এবং পেটের ডান দিকের উপরের অংশে অস্বস্তি।
  • শুরুর দিকে হালকা জ্বর ও সার্বিক অসুস্থ অনুভূতি।

অসুস্থতা সাধারণত কয়েক সপ্তাহে কমে আসে, তবে ক্লান্তি কিছুদিন থেকে যেতে পারে। বেশিরভাগ মানুষেরই হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় না।

গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস ই কেন বিপজ্জনক?

পরিবারের জন্য এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গর্ভবতী নারীদের, বিশেষ করে শেষ তিন মাসে, হেপাটাইটিস ই অনেক বেশি জটিল হতে পারে এবং লিভার বিকল হয়ে মা ও শিশু উভয়ের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। কোনো গর্ভবতী নারীর জন্ডিস, বমি বা অস্বাভাবিক ঝিমুনি দেখা দিলে দেরি না করে অবশ্যই ডাক্তার দেখাতে হবে। এ কারণেই গর্ভাবস্থায় নিরাপদ পানি ও খাবার এত জরুরি।

ঘরে কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?

যেহেতু এই ভাইরাস আমাদের খাওয়া ও পান করার জিনিসের মাধ্যমে ছড়ায়, রান্নাঘর ও পরিচ্ছন্নতার সাধারণ অভ্যাসই শক্তিশালী সুরক্ষা।

  • শুধু ফুটানো, ফিল্টার করা বা সঠিকভাবে বিশুদ্ধ করা পানি পান করুন; বরফ ও রাস্তার পানীয়তে সাবধান থাকুন।
  • টয়লেটের পর এবং রান্না বা খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
  • টাটকা, গরম রান্না করা খাবার খান; কেটে রাখা ফল, সালাদ ও দোকানে খোলা রাখা খাবার এড়িয়ে চলুন।
  • ফল ও সবজি পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিন এবং সম্ভব হলে খোসা ছাড়িয়ে খান।
  • খাবার থেকে মাছি দূরে রাখুন এবং রান্না করা খাবার ঢেকে রাখুন।

হেপাটাইটিস এ-এর টিকা পাওয়া যায় এবং এ নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা যায়, বিশেষ করে ভ্রমণকারী ও শিশুদের জন্য; বাংলাদেশে হেপাটাইটিস ই-এর কোনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত টিকা এখনো নেই।

সুস্থ হয়ে ওঠা কীভাবে সামলাবেন?

এই ভাইরাস মারার বিশেষ কোনো ওষুধ নেই; সময়ের সঙ্গে লিভার নিজেই সেরে ওঠে। যত্নের মূল কথা শরীরকে সহায়তা করা: বিশ্রাম, পর্যাপ্ত নিরাপদ তরল এবং হালকা, সহজপাচ্য খাবার। অ্যালকোহল পুরোপুরি এড়িয়ে চলুন এবং ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ, ভেষজ পণ্য বা ব্যথানাশক খাবেন না, কারণ কিছু জিনিস লিভারের ওপর চাপ ফেলতে পারে। কখনোই নিজে নিজে ওষুধ নেবেন না; কোনটি নিরাপদ তা মেডিসিন ডিরেক্টরিতে যাচাই করুন এবং প্যারাসিটামলের মতো ওষুধের বিষয়ে ব্যবহারের আগে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নিন।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

চোখ হলুদ হওয়া, গাঢ় প্রস্রাব বা একটানা বমি দেখলে ডাক্তার দেখান। বারবার বমির কারণে পানি খেতে না পারা, তীব্র ঝিমুনি বা বিভ্রান্তি, মাড়ি দিয়ে রক্তপাত বা সহজে কালশিটে পড়া, কিংবা গর্ভাবস্থায় জন্ডিস হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন, কারণ এগুলো গুরুতর লিভার সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। লিভার বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ খুঁজে নিতে পারেন আমাদের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দেখুন তালিকা থেকে, আর নিরাপদ খাবার ও পানি নিয়ে পড়ুন আরও স্বাস্থ্য টিপস

সচরাচর জিজ্ঞাসা

হেপাটাইটিস এ ও ই কি ছোঁয়াচে?

হ্যাঁ। মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির মলের সামান্য অংশ অপরিষ্কার হাত, ভাগ করা খাবার বা দূষিত পানির মাধ্যমে অন্যের মুখে পৌঁছালে এগুলো ছড়ায়। যত্ন করে হাত ধোয়া, নিরাপদ পানি এবং অসুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে বাসনপত্র ভাগ না করা ঝুঁকি অনেকটা কমায়।

হেপাটাইটিসের জন্ডিস কতদিন থাকে?

বেশিরভাগ মানুষের হলুদ ভাব ও খারাপ উপসর্গ দুই থেকে চার সপ্তাহে কমে আসে, যদিও ক্লান্তি আরও কিছুদিন থাকতে পারে। সাধারণত পুরোপুরি সেরে ওঠে। জন্ডিস না কমলে বা বাড়তে থাকলে অবশ্যই ডাক্তার দেখাতে হবে।

হেপাটাইটিসে কি প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে?

শুধু ডাক্তারের পরামর্শে। লিভার এমনিতেই চাপের মধ্যে থাকে, তাই ব্যথানাশক ও অন্যান্য ওষুধ সাবধানে এবং সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। কখনো নিজে নিজে ওষুধ নেবেন না; কিছু খাওয়ার আগে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন, আর ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল দিয়ে আপনার চিকিৎসার রেকর্ড রাখতে পারেন।

হেপাটাইটিস এ-এর টিকা কি নেওয়া উচিত?

অনেক শিশু ও ভ্রমণকারীর জন্য এটি উপকারী এবং দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেয়। বিষয়টি ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করুন। বাংলাদেশে হেপাটাইটিস ই-এর ব্যাপকভাবে পাওয়া যায় এমন টিকা নেই, তাই নিরাপদ খাবার ও পানিই মূল প্রতিরক্ষা।

এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

এই তথ্যটি কি আপনার কাজে লেগেছে?