প্রোস্টেট বড় হওয়া: লক্ষণ ও চিকিৎসা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদের প্রোস্টেট গ্রন্থি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, আর ষাট-সত্তরের কোঠায় বাংলাদেশের বেশিরভাগ পুরুষই প্রস্রাবের ধরনে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করেন। প্রোস্টেটের এই সাধারণ, ক্যান্সারবিহীন বড় হওয়াকে বলা হয় বিনাইন প্রোস্ট্যাটিক হাইপারপ্লাসিয়া বা বিপিএইচ। রাতে বারবার টয়লেটে যাওয়ার কারণে ঘুম ভাঙে বলে এটি বেশ ভোগায়, তবে সাধারণত এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। কোনটা স্বাভাবিক, কীসে উপকার হয় আর কোনটা সতর্ক-সংকেত—এটুকু জানলে অনেক দুশ্চিন্তা কমে এবং বড় জটিলতা এড়ানো যায়।
প্রোস্টেট কী এবং কেন বড় হয়?
প্রোস্টেট একটি ছোট গ্রন্থি, যা মূত্রথলির নিচে থাকে এবং মূত্রনালীকে (যে নল দিয়ে প্রস্রাব বের হয়) ঘিরে রাখে। বয়সের সঙ্গে এটি বড় হলে এই নলকে চেপে ধরে এবং প্রস্রাবের গতি কিছুটা আটকে দেয়। হরমোনের পরিবর্তনের কারণে এটি বয়সজনিত স্বাভাবিক ঘটনা—এটি কোনো সংক্রমণ বা আপনার দোষে হওয়া রোগ নয়। বিপিএইচ প্রোস্টেট ক্যান্সার নয় এবং ক্যান্সারে রূপ নেয় না, যদিও দুটোই একসঙ্গে থাকতে পারে—এ কারণেই ঠিকমতো পরীক্ষা করানো জরুরি।
লক্ষণ ও সতর্ক-সংকেত কী কী?
বিপিএইচের লক্ষণ মাস-বছর ধরে ধীরে ধীরে আসে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
- ঘন ঘন প্রস্রাব, বিশেষ করে রাতে কয়েকবার ঘুম ভেঙে যাওয়া।
- প্রস্রাবের ধারা দুর্বল বা ধীর, থেমে থেমে আসা।
- প্রস্রাব শুরু করতে কষ্ট এবং শেষে ফোঁটা ফোঁটা পড়া।
- মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হয়নি এমন অনুভূতি।
- হঠাৎ প্রবল প্রস্রাবের বেগ, যা সামলানো কঠিন।
যেসব সতর্ক-সংকেতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে: প্রস্রাবে রক্ত, একেবারে প্রস্রাব বন্ধ হয়ে তলপেট ফুলে ব্যথা, জ্বরসহ প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, কিংবা অকারণে ওজন কমা ও হাড়ে ব্যথা।
কীসে লক্ষণ আরও বাড়ে?
সামান্য বড় হওয়া প্রোস্টেটকে কিছু সাধারণ অভ্যাস অনেক বেশি কষ্টকর করে তুলতে পারে। সন্ধ্যার পর বেশি পানি, চা বা কফি খেলে রাতে মূত্রথলি ভরে যায়। দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখা, ঠান্ডা আবহাওয়া এবং কিছু ঠান্ডা বা অ্যালার্জির ওষুধ হঠাৎ প্রস্রাব পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্য ও ভরা পেটও মূত্রথলিতে চাপ দেয়, তাই পেট পরিষ্কার রাখা উপকারী।
ঘরে কীভাবে যত্ন নেবেন?
হালকা লক্ষণে অনেকেই সহজ কিছু পরিবর্তনে ভালো বোধ করেন। দিনের বেলায় বেশিরভাগ পানি খান এবং ঘুমানোর দুই-তিন ঘণ্টা আগে পানি কমিয়ে দিন। চা, কফি ও মদ কমান, তাড়াহুড়ো না করে ধীরে-সুস্থে মূত্রথলি পুরো খালি করুন এবং এক-দুই মিনিট পর আবার একবার প্রস্রাব করুন (ডাবল ভয়েডিং)। সক্রিয় থাকুন, কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে আঁশযুক্ত খাবার খান এবং প্রস্রাবের বেগ বেশিক্ষণ চেপে রাখবেন না।
চিকিৎসা কী কী আছে?
জীবনযাত্রার পরিবর্তনে যথেষ্ট না হলে ডাক্তার এমন ওষুধ দেন যা প্রোস্টেটের চারপাশের পেশি শিথিল করে প্রস্রাব সহজ করে, কিংবা কয়েক মাসে গ্রন্থিটি ছোট করে আনে। এসব ওষুধ ডাক্তারের পরামর্শে নিতে হয়, কারণ এগুলো রক্তচাপ কমাতে পারে বা অন্য ওষুধের সঙ্গে বিক্রিয়া করতে পারে—অন্য কারও ট্যাবলেট কখনো ভাগ করে খাবেন না। সাধারণভাবে ব্যবহৃত ওষুধ সম্পর্কে জানতে আমাদের মেডিসিন ডিরেক্টরি দেখতে পারেন, তবে সঠিক ওষুধ আপনার পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে। ওষুধে কাজ না হলে বা প্রোস্টেট খুব বড় হলে ছোট একটি অপারেশনে বাধা দূর করা যায়। চিকিৎসা গুছিয়ে রাখতে আমাদের ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল ডাক্তারকে পরিষ্কার রেকর্ড রাখতে সাহায্য করতে পারে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
রাতের প্রস্রাবে ঘুম নষ্ট হলে, প্রস্রাবের ধারা ক্রমশ দুর্বল হলে, কিংবা মূত্রথলি কখনো খালি হয় না মনে হলে ডাক্তার দেখান। আর যদি একেবারে প্রস্রাব না হয়, প্রস্রাবে রক্ত দেখেন, অথবা জ্বরসহ জ্বালাপোড়া থাকে—তবে দ্রুত যান। একটি সাধারণ পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা ও পিএসএ রক্ত পরীক্ষা নিরীহ বিপিএইচকে অন্য জটিল সমস্যা থেকে আলাদা করতে সাহায্য করে। যোগ্য ইউরোলজিস্ট দেখাতে আমাদের তালিকা থেকে একজন বিশেষজ্ঞ বেছে নিন এবং অন্য কারণ যাচাই করুন। পুরুষস্বাস্থ্য ও বয়সজনিত বিষয়ে আরও জানতে দেখুন আমাদের আরও স্বাস্থ্য টিপস।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রোস্টেট বড় হওয়া মানে কি ক্যান্সার?
না। বিপিএইচ একটি ক্যান্সারবিহীন, নিরীহ বড় হওয়া এবং এটি ক্যান্সারে রূপ নেয় না। তবে প্রোস্টেট ক্যান্সারে একই রকম লক্ষণ হতে পারে বলে নিশ্চিত হতে ডাক্তার পিএসএ রক্ত পরীক্ষা ও পরীক্ষা করাতে বলতে পারেন।
বিপিএইচ কি পুরোপুরি ভালো হয়?
বিপিএইচ সাধারণত পুরোপুরি সারে না, নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও ওষুধে বছরের পর বছর লক্ষণ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে, আর গ্রন্থি খুব বড় হলে বা ওষুধে কাজ না হলে অপারেশন দীর্ঘস্থায়ী আরাম দিতে পারে।
রাতে কয়েকবার প্রস্রাবে ওঠা কি বিপজ্জনক?
রাতে বারবার প্রস্রাব অস্বস্তিকর ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, তবে এটি নিজে থেকে তাৎক্ষণিক বিপজ্জনক নয়। ডাক্তার দেখানো ভালো, কারণ এটি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা রাতে বেশি পানি খাওয়ার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।
পানি কম খেলে কি উপকার হবে?
দিনে স্বাভাবিকভাবে পানি খান, কারণ খুব কম পানিতে সংক্রমণ ও পাথর হতে পারে। শুধু বেশিরভাগ পানি দিনের বেলায় খান এবং ঘুমানোর দুই-তিন ঘণ্টা আগে পানীয় কমিয়ে দিন, যাতে রাতে কম উঠতে হয়।