কোলন ক্যান্সার: বিপদচিহ্ন ও স্ক্রিনিং
কোলন ক্যান্সার, যাকে কোলোরেক্টাল বা অন্ত্রের ক্যান্সারও বলা হয়, বৃহদন্ত্র ও মলাশয়ে হয়। সাধারণত এটি পলিপ নামের একটি ছোট, নিরীহ গুটি হিসেবে শুরু হয়, যা বহু বছরে ধীরে ধীরে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়ই কোনো উপসর্গ না থাকায় বাংলাদেশে অনেকেরই দেরিতে রোগ ধরা পড়ে, যখন চিকিৎসা কঠিন হয়ে যায়। অথচ পলিপ আগেভাগে সরিয়ে ফেললে বা সময়মতো ধরা পড়লে এটি সবচেয়ে প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য ক্যান্সারগুলোর একটি। বিপদচিহ্ন ও স্ক্রিনিংয়ের গুরুত্ব জানা সত্যিই আপনার জীবন বাঁচাতে পারে।
কোলন ক্যান্সারের বিপদচিহ্ন কী কী?
কোলন ক্যান্সার শুরুতে নীরব থাকতে পারে, তাই নিচের কোনো উপসর্গ—বিশেষ করে দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে—ডাক্তারের নজরে আনা দরকার:
- পায়খানায় রক্ত, উজ্জ্বল লাল কিংবা কালো-আলকাতরার মতো।
- পায়খানার অভ্যাসে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন, যেমন নতুন কোষ্ঠকাঠিন্য, পাতলা পায়খানা বা সরু-চিকন পায়খানা।
- পায়খানার পরও পেট পুরোপুরি খালি না হওয়ার অনুভূতি।
- একটানা পেটে খিঁচ, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি।
- কারণ ছাড়া ওজন কমা ও সারাক্ষণ ক্লান্তি।
- স্পষ্ট কারণ ছাড়াই রক্ত পরীক্ষায় রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া) ধরা পড়া।
রক্তপাতকে প্রায়ই পাইলস (অর্শ) বলে ধরে নেওয়া হয়, আর পাইলস সাধারণ হলেও ভালোভাবে পরীক্ষা না করিয়ে একে কারণ বলে ধরে নেবেন না, কারণ উপসর্গগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।
কাদের ঝুঁকি বেশি?
বয়সের সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ে, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পঞ্চাশের পর হয়, যদিও কম বয়সীরাও আক্রান্ত হতে পারেন। অন্যান্য ঝুঁকির মধ্যে আছে পরিবারে কোলন ক্যান্সার বা পলিপের ইতিহাস, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা, ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান। লাল ও প্রক্রিয়াজাত মাংস বেশি এবং আঁশ, ফল ও শাকসবজি কম এমন খাদ্যাভ্যাস, সেইসঙ্গে নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনও ঝুঁকি বাড়ায়।
স্ক্রিনিং কীভাবে সাহায্য করে?
স্ক্রিনিং মানে উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই ক্যান্সার পরীক্ষা করা, আর এটি শক্তিশালী কারণ পলিপ ক্যান্সারে রূপ নেওয়ার আগেই খুঁজে বের করে সরিয়ে ফেলা যায়। কোলোনোস্কোপিতে ডাক্তার সরাসরি অন্ত্রের ভেতরে দেখেন এবং একই বসায় পলিপ সরিয়ে দিতে পারেন। পায়খানায় লুকানো রক্ত পরীক্ষার সহজ একটি পদ্ধতিও আছে, যা নিয়মিত পুনরায় করা যায়। সাধারণ ঝুঁকির মানুষদের সাধারণত পঞ্চাশ বছরের কাছাকাছি স্ক্রিনিং শুরু করতে বলা হয়, আর পরিবারে ইতিহাস বা অন্য ঝুঁকি থাকলে আগেই শুরু করা লাগতে পারে। আপনার জন্য সঠিক পরীক্ষা ও সময় ডাক্তার পরামর্শ দিতে পারবেন।
খাদ্য ও জীবনযাত্রায় কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন?
প্রতিদিনের অভ্যাস অন্ত্রের স্বাস্থ্যে সত্যিকারের পার্থক্য গড়ে। কিছু পরিবর্তনই অনেকটা কাজে দেয়:
- শাকসবজি, ফল, লাল চাল, ওটস, ডাল ও গোটা শস্য থেকে প্রচুর আঁশ খান।
- লাল মাংস কম খান ও প্রক্রিয়াজাত মাংস এড়িয়ে চলুন; বেশি করে মাছ, মুরগি ও ডাল বেছে নিন।
- নিয়মিত হাঁটা বা অন্য ব্যায়ামে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন।
- স্বাস্থ্যকর ওজন রাখুন এবং ডায়াবেটিস ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- ধূমপান ছাড়ুন এবং মদ্যপান সীমিত করুন।
- হজম ভালো রাখতে যথেষ্ট পানি পান করুন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
পায়খানায় রক্ত, দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী পায়খানার অভ্যাসের পরিবর্তন, একটানা পেটব্যথা, কিংবা কারণ ছাড়া ওজন কমা বা ক্লান্তি দেখলে—পাইলস ভেবে বসে না থেকে—দ্রুত ডাক্তার দেখান। বেশি মলদ্বার-রক্তপাত, প্রচণ্ড পেটব্যথা, কিংবা পেট ফুলে-ব্যথা নিয়ে বমি হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন, কারণ এটি অন্ত্রের বাধার ইঙ্গিত হতে পারে। আগেভাগে পরীক্ষা এবং পঞ্চাশোর্ধ্ব হলে বা পারিবারিক ইতিহাস থাকলে স্ক্রিনিং সুস্থ হওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ দেয়। গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বা জেনারেল সার্জন খুঁজে নিতে পারেন আমাদের প্রাসঙ্গিক বিশেষজ্ঞ তালিকা থেকে। রক্তস্বল্পতার জন্য ডাক্তার আয়রন বা অন্য ওষুধ দিলে তা আমাদের মেডিসিন ডিরেক্টরিতে যাচাই করে নিতে পারেন। প্রতিরোধ ও সুস্থ জীবনযাপন নিয়ে আরও জানতে দেখুন আমাদের আরও স্বাস্থ্য টিপস।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
পায়খানায় রক্ত মানেই কি ক্যান্সার?
না। বেশিরভাগ মলদ্বার-রক্তপাত ক্যান্সার নয়, বরং পাইলস বা অ্যানাল ফিসারের কারণে হয়। তবে নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র উপায় ডাক্তারের পরীক্ষা, কারণ অন্ত্রের ক্যান্সারেও একই উপসর্গ হতে পারে এবং আগেভাগে ধরা পড়লে তা অনেক বেশি চিকিৎসাযোগ্য।
কোন বয়সে কোলন ক্যান্সারের স্ক্রিনিং শুরু করা উচিত?
সাধারণ ঝুঁকির মানুষদের জন্য স্ক্রিনিং সাধারণত পঞ্চাশ বছরের কাছাকাছি শুরু হয়। পরিবারে কোলন ক্যান্সার বা পলিপের ইতিহাস বা অন্য ঝুঁকি থাকলে ডাক্তার আগেই শুরু করার পরামর্শ দিতে পারেন। সঠিক সময় আপনার ইতিহাস জানা ডাক্তারের সঙ্গে ঠিক করাই ভালো।
কোলোনোস্কোপি কি কষ্টকর?
কোলোনোস্কোপি সাধারণত হালকা ঘুমের ওষুধ দিয়ে করা হয়, তাই বেশিরভাগ মানুষ সামান্য বা কোনো ব্যথা অনুভব করেন না এবং পরীক্ষাটি মনেও থাকে না। আগে অন্ত্র পরিষ্কারের প্রস্তুতিটাই কিছুটা অস্বস্তিকর, তবে স্পষ্ট ও সঠিক পরীক্ষার জন্য তা জরুরি।
শুধু স্বাস্থ্যকর খাবারেই কি কোলন ক্যান্সার রোধ করা যায়?
আঁশসমৃদ্ধ খাবার, নিয়মিত চলাফেরা এবং তামাক ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়ানো ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়, তবে পুরোপুরি দূর করতে পারে না। স্ক্রিনিং তাই গুরুত্বপূর্ণ থেকে যায়, কারণ এটি পলিপ ক্যান্সারে রূপ নেওয়ার আগেই খুঁজে বের করে সরাতে পারে।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। নিজের অবস্থা সম্পর্কে যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।