শিশুর টিকার সময়সূচি: বাংলাদেশের ইপিআই গাইড
টিকা শিশুকে রক্ষা করার সবচেয়ে নিরাপদ ও শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি, আর বাংলাদেশ এই অঞ্চলের অন্যতম সফল টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সারা দেশের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই আউটরিচ সেশনে বিনামূল্যে জীবনরক্ষাকারী টিকা দেয়। সময়মতো সময়সূচি মেনে চললে শিশু সেইসব রোগ থেকে শক্ত সুরক্ষা পায়, যেগুলো একসময় বহু শিশুকে মেরে ফেলত বা পঙ্গু করত। এই গাইডে বলা হয়েছে কী দেওয়া হয়, কখন এবং কেন।
ইপিআই কর্মসূচি কী?
ইপিআই হলো বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত জাতীয় শিশু-টিকাদান কর্মসূচি। এটি বিনামূল্যে টিকা দেয় এবং দুই বছর বয়সের আগেই প্রতিটি শিশুকে কয়েকটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে রক্ষা করতে চায়। নির্দিষ্ট বয়সে টিকা দেওয়া হয়, যাতে শিশু যখন সবচেয়ে দুর্বল ঠিক তখনই সুরক্ষা গড়ে ওঠে। আপনাকে একটি ইপিআই কার্ড দেওয়া হবে, যেখানে প্রতিটি ডোজ লেখা থাকে; এটি যত্নে রাখুন এবং প্রতিবার সঙ্গে নিয়ে আসুন।
বয়স অনুযায়ী টিকার সময়সূচি কী?
সাধারণ সময়সূচি শিশুর বয়স অনুসরণ করে। সঠিক বিস্তারিত আপনার টিকাদানকর্মী নিশ্চিত করলেও মোটা দাগে সময়সূচিটি হলো:
- জন্মের সময়: বিসিজি (যক্ষ্মার বিরুদ্ধে) এবং ওরাল পোলিও ও হেপাটাইটিস বি-এর প্রথম ডোজ।
- ৬ সপ্তাহ: পেন্টাভ্যালেন্ট, পিসিভি (নিউমোকক্কাল), ওরাল পোলিও ও ফ্র্যাকশনাল আইপিভি-এর প্রথম ডোজ।
- ১০ সপ্তাহ: পেন্টাভ্যালেন্ট, পিসিভি ও ওরাল পোলিও-এর দ্বিতীয় ডোজ।
- ১৪ সপ্তাহ: পেন্টাভ্যালেন্ট, পিসিভি, ওরাল পোলিও-এর তৃতীয় ডোজ ও দ্বিতীয় ফ্র্যাকশনাল আইপিভি।
- ৯ মাস: হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার প্রথম ডোজ।
- ১৫ মাস: হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার দ্বিতীয় ডোজ।
সবসময় আপনার শিশুর ইপিআই কার্ডে লেখা তারিখ এবং কেন্দ্রের টিকাদানকর্মীর পরামর্শ মেনে চলুন।
এই টিকাগুলো কোন রোগ প্রতিরোধ করে?
প্রতিটি টিকা গুরুতর অসুখ থেকে রক্ষা করে। শুধু পেন্টাভ্যালেন্ট টিকাই পাঁচটি রোগ প্রতিরোধ করে: ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি (পারটুসিস), ধনুষ্টংকার (টিটেনাস), হেপাটাইটিস বি এবং হিব (মেনিনজাইটিস ও নিউমোনিয়ার বড় কারণ)। বিসিজি মারাত্মক যক্ষ্মা কমায়, পোলিও টিকা সারাজীবনের পঙ্গুত্ব ঠেকায়, পিসিভি নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিস থেকে রক্ষা করে এবং এমআর টিকা হাম ও রুবেলা প্রতিরোধ করে। সব মিলিয়ে এগুলো শিশুকে এমন সংক্রমণ থেকে আড়াল করে, যা মৃত্যু, মস্তিষ্কের ক্ষতি, বধিরতা বা পঙ্গুত্ব ঘটাতে পারে।
শিশুর কোনো ডোজ বাদ পড়লে কী হবে?
ডোজ বাদ পড়া সাধারণ ব্যাপার এবং এটি কোনো বিপর্যয় নয়। বাদ পড়া ডোজ প্রায় সবসময়ই পরে দেওয়া যায়, আর পুরো কোর্স আবার শুরু করতে হয় না। যত দ্রুত পারেন ইপিআই কার্ড নিয়ে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা ইপিআই সেশনে যান, টিকাদানকর্মী যেখানে থেমেছিল সেখান থেকেই সময়সূচি চালু করবেন। লক্ষ্য হলো একটু দেরিতে হলেও সব ডোজ সম্পূর্ণ করা, শিশুকে অরক্ষিত না রাখা।
টিকার পর হালকা জ্বর কীভাবে সামলাবেন?
টিকার পর এক-দুই দিন হালকা জ্বর, খিটখিটে ভাব, বা ইনজেকশনের জায়গায় সামান্য ফোলা ও লালচে ভাব সাধারণ এবং এতে বোঝা যায় শরীরের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা সাড়া দিচ্ছে। শিশুকে আরামে রাখতে:
- বেশি করে বুকের দুধ বা তরল দিন এবং শিশুকে বিশ্রাম নিতে দিন।
- ব্যথার জায়গায় পরিষ্কার ঠান্ডা কাপড় রাখুন; ঘষা বা মালিশ করবেন না।
- জ্বর বা অস্বস্তিতে ওজন অনুযায়ী মাত্রায় মেডিসিন ডিরেক্টরিতে থাকা প্যারাসিটামল সাহায্য করতে পারে, তবে শুধু ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শে।
কখনো বড়দের ওষুধ দেবেন না বা ডোজ অনুমান করবেন না। ব্যবস্থাপত্র রাখলে আমাদের ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল তা পরিষ্কারভাবে সংরক্ষণে সাহায্য করে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
বেশিরভাগ প্রতিক্রিয়া হালকা এবং নিজে থেকেই কমে যায়। জ্বর বেশি হলে বা দুই দিনের বেশি থাকলে, শিশু অস্বাভাবিক ঝিমিয়ে পড়লে বা সব খাবার প্রত্যাখ্যান করলে, কিংবা ইনজেকশনের জায়গায় বড়, গরম, ছড়িয়ে পড়া ফোলা হলে ডাক্তার দেখান। টিকার পরপরই খিঁচুনি, শ্বাস নিতে কষ্ট, মুখ বা ঠোঁট ফুলে যাওয়া, বা র্যাশের সঙ্গে নেতিয়ে পড়া হলে সঙ্গে সঙ্গে জরুরি চিকিৎসা নিন—কারণ এই বিরল প্রতিক্রিয়াগুলোতে দ্রুত চিকিৎসা দরকার। একজন যোগ্য শিশুরোগ বিশেষজ্ঞকে খুঁজে নিতে পারেন আমাদের নিবন্ধিত ডাক্তারের তালিকা থেকে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
ইপিআই টিকা কি সত্যিই বিনামূল্যে?
হ্যাঁ। ইপিআই টিকা বাংলাদেশ সরকার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক ও আউটরিচ সেশনে বিনামূল্যে দেয়। সময়সূচির সাধারণ শিশু-টিকার জন্য আপনার কোনো টাকা দেওয়ার কথা নয়।
শিশুর হালকা সর্দি থাকলে কি টিকা দেওয়া নিরাপদ?
বেশি জ্বর ছাড়া হালকা সর্দি সাধারণত টিকা পিছিয়ে দেওয়ার কারণ নয়। শিশুর বেশি জ্বর থাকলে বা সে গুরুতর অসুস্থ হলে টিকাদানকর্মী কয়েক দিন পর আসতে বলতে পারেন। সংশয় থাকলে স্বাস্থ্যকর্মীকে জিজ্ঞাসা করুন।
টিকা কি অটিজম বা গুরুতর ক্ষতি করে?
না। বড় বড় গবেষণায় টিকা ও অটিজমের মধ্যে কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। প্রাণঘাতী রোগ থেকে শিশুকে রক্ষার উপকারিতা হালকা, স্বল্পস্থায়ী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সামান্য ঝুঁকির চেয়ে অনেক বেশি।
ইপিআই কার্ড হারিয়ে গেলে কী করব?
নিকটস্থ ইপিআই কেন্দ্রে যান; কর্মীরা প্রায়ই রেকর্ড যাচাই করে নতুন কার্ড দিতে পারেন, যাতে সময়সূচি সঠিকভাবে চলতে থাকে। শিশু-স্বাস্থ্য নিয়ে আরও দিকনির্দেশনা পাবেন আমাদের স্বাস্থ্য টিপস সংগ্রহে।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়, তাই নিজের শিশুর জন্য একজন যোগ্য ডাক্তার বা আপনার ইপিআই কেন্দ্রের পরামর্শ নিন।