ছানি: ঝাপসা দৃষ্টি, অপারেশন ও চোখের যত্ন
বাংলাদেশে বয়স্ক মানুষের ধীরে ধীরে দৃষ্টি কমে যাওয়ার অন্যতম সাধারণ কারণ হলো ছানি, অথচ এটি সবচেয়ে সহজে চিকিৎসাযোগ্য সমস্যাগুলোর একটি। অনেক বয়স্ক মানুষ ঝাপসা দেখাকে বয়সের স্বাভাবিক অংশ ভেবে মেনে নেন এবং প্রয়োজনের অনেক আগেই পড়া, সেলাই বা পরিচিত মুখ চেনা ছেড়ে দেন। ভালো খবর হলো, ছানি অপারেশন নিরাপদ, দ্রুত এবং প্রায় সবার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়। প্রাথমিক লক্ষণ জানা থাকলে পরিবার ঠিক সময়েই সাহায্য নিতে পারে, দৃষ্টি প্রায় হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না।
ছানি কী?
চোখের ভেতরে একটি স্বচ্ছ লেন্স থাকে, যা ক্যামেরার লেন্সের মতো আলোকে রেটিনায় কেন্দ্রীভূত করে। বয়সের সঙ্গে এই লেন্স ধীরে ধীরে ঘোলাটে ও হলদেটে হয়ে যায়, আলো ছড়িয়ে দেয় এবং দৃশ্য ঝাপসা করে তোলে। এই ঘোলা হয়ে যাওয়াকেই ছানি বলে। এটি সাধারণত মাস বা বছর ধরে ধীরে ধীরে বাড়ে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষকে আক্রান্ত করে, তবে ডায়াবেটিস, চোখে আঘাত বা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ব্যবহারে কম বয়সেও হতে পারে।
সতর্ক-সংকেত কী কী?
ছানির উপসর্গ ধীরে ধীরে আসে, তাই কী লক্ষ্য করতে হবে তা জেনে রাখা জরুরি:
- ঝাপসা, ঘোলা বা কুয়াশাচ্ছন্ন দৃষ্টি, যা চশমাতেও ঠিক হয় না।
- রোদ বা রাতে গাড়ির আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া ও অস্বস্তি।
- রং ফ্যাকাশে, নিষ্প্রভ বা হলদেটে দেখা।
- পড়া বা সেলাইয়ের জন্য বেশি আলো লাগা।
- ঘন ঘন চশমার পাওয়ার বদলানো।
- বেশি বেড়ে গেলে চোখের মণিতে দুধসাদা ভাব দেখা যাওয়া।
ছানির কারণ ও ঝুঁকি কাদের বেশি?
মূল কারণ বয়স বাড়া, তবে কয়েকটি বিষয় এটি দ্রুত করে তোলে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, সুরক্ষা ছাড়া দীর্ঘক্ষণ কড়া রোদে থাকা, ধূমপান, আগের চোখের আঘাত এবং দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ওষুধ ব্যবহার—সবই ঝুঁকি বাড়ায়। রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বাইরে রোদচশমা পরা ছানির বৃদ্ধি ধীর করতে পারে। ডায়াবেটিসের রোগীদের চোখ রক্ষার জন্য আমাদের আরও স্বাস্থ্য টিপস পড়া উচিত, কারণ ডায়াবেটিক চোখের ক্ষতি ও ছানি একসঙ্গেও হতে পারে।
ছানির চিকিৎসা কীভাবে হয়?
কোনো ড্রপ বা ট্যাবলেট ছানি গলিয়ে দেয় না; অপারেশনই একমাত্র প্রমাণিত চিকিৎসা। আধুনিক ছানি অপারেশনে ঘোলা লেন্সটি সরিয়ে একটি স্বচ্ছ কৃত্রিম লেন্স (ইন্ট্রাঅকুলার লেন্স) বসিয়ে দেওয়া হয়। এটি সাধারণত স্থানীয় অবেদন দিয়ে অল্প সময়ের ডে-কেয়ার অপারেশন, এবং বেশিরভাগ মানুষ এক-দুই দিনেই স্পষ্ট দেখতে পান। ঝাপসা দৃষ্টি যখন দৈনন্দিন জীবন, পড়া, রান্না বা নিরাপদে চলাফেরায় বাধা দেয়, তখনই অপারেশনের পরামর্শ দেওয়া হয়। ছানি পুরো সাদা বা শক্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার নেই। একজন চক্ষু সার্জন বলে দেবেন আপনি প্রস্তুত কি না।
অপারেশনের পর চোখের যত্ন কীভাবে নেবেন?
কিছু সহজ নিয়ম মানলে সেরে ওঠা সাধারণত মসৃণ হয়। নির্ধারিত ড্রপ সময়মতো দিন, চোখ ঘষা বা নোংরা পানি ছিটানো এড়িয়ে চলুন, বাইরে সুরক্ষা চশমা পরুন এবং কয়েক সপ্তাহ ভারী জিনিস তোলা বা ঝুঁকে কাজ করা থেকে বিরত থাকুন। নিরাময় যাচাইয়ের জন্য ফলোআপ ঠিক রাখুন। কোনো ড্রপ যাচাই করতে চাইলে আন্দাজে না কিনে আমাদের মেডিসিন ডিরেক্টরিতে দেখে নিন, আর ডাক্তার লিখিত রেকর্ড রাখতে বললে ফ্রি প্রেসক্রিপশন টুল ব্যবহার করুন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
দৃষ্টি ঝাপসা বা ঘোলা হলে, রাতে আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেলে, কিংবা মুখ চেনা ও পড়া কঠিন হলে চক্ষু বিশেষজ্ঞ দেখান। হঠাৎ দৃষ্টি হারানো, চোখে ব্যথা, লালভাব, আলোর ঝলকানি বা চোখের সামনে পর্দা নেমে আসার মতো লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসা নিন, কারণ এগুলো ছানির বাইরে গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। যোগ্য চক্ষু বিশেষজ্ঞ খুঁজে নিতে পারেন আমাদের নিবন্ধিত ডাক্তারের তালিকা থেকে। এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য; এটি পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়, নিজের অবস্থার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
অপারেশন ছাড়া ড্রপ দিয়ে কি ছানি সারে?
না। অনেক বিজ্ঞাপন থাকলেও কোনো ড্রপ বা ট্যাবলেট ছানি দূর করতে পারে না। ঘোলা লেন্স বদলে দেওয়ার অপারেশনই একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা, যা নিরাপদ ও দ্রুত।
ছানি অপারেশন কি ব্যথাদায়ক?
ড্রপ বা ছোট ইনজেকশন দিয়ে চোখ অবশ করা হয়, তাই অপারেশনে ব্যথা হয় না। বেশিরভাগ মানুষ কেবল হালকা চাপ অনুভব করেন এবং সেদিনই বাড়ি ফেরেন।
অপারেশনের পর কি চশমা লাগবে?
অনেকে অপারেশনের পর দূরের জিনিস ভালো দেখেন, তবে পড়ার জন্য চশমা লাগতে পারে। ফলাফল নির্ভর করে কোন লেন্স বসানো হলো তার ওপর, যা সার্জন আপনার সঙ্গে আলোচনা করবেন।
অপারেশনের পর কি আবার ছানি হয়?
ছানি নিজে আর ফিরে আসে না, তবে নতুন লেন্সের পেছনের পর্দা মাস বা বছর পরে ঘোলা হতে পারে। এটি দ্রুত ও ব্যথাহীন লেজার দিয়ে সহজেই পরিষ্কার করা যায়।